বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে অনেক জনপ্রিয় নায়ক এসেছেন, অনেকেই দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। কিন্তু ফ্যাশন ও স্টাইলের ক্ষেত্রে একটি নাম এখনো আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়, তিনি সালমান শাহ্। নব্বইয়ের দশকে তিনি শুধু একজন সফল নায়ক ছিলেন না, ছিলেন তরুণদের ফ্যাশন আইকন। তার পোশাক, চুলের স্টাইল, জুতা, সানগ্লাস থেকে শুরু করে হাতঘড়ি পর্যন্ত অনুকরণ করতেন অসংখ্য ভক্ত। অথচ তার মৃত্যুর তিন দশক পরও ঢাকাই সিনেমায় তেমন কোনো নায়ক বা নায়িকা তৈরি হয়নি, যার ফ্যাশন ট্রেন্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
সালমান শাহের সিনেমা জীবন ছিল মাত্র চার বছরের। কিন্তু এ স্বল্প সময়েই তিনি বাংলাদেশের সিনেমা সংস্কৃতিতে এমন এক প্রভাব রেখে গেছেন, যা এখনো আলোচনায় আসে। তার অভিনীত সিনেমাগুলোর গান কিংবা রোমান্টিক দৃশ্যে দেখা যেত ভিন্নধর্মী পোশাকের ব্যবহার। কখনো ঢিলেঢালা শার্ট, কখনো ডেনিম জ্যাকেট, কখনো রঙিন টি-শার্টের সঙ্গে স্টাইলিশ ক্যাপ কিংবা ব্যতিক্রমী সানগ্লাস, সবকিছুতেই ছিল নতুনত্বের ছাপ।
বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে তরুণদের মধ্যে ‘সালমান স্টাইল’ নামে একটি আলাদা ফ্যাশনধারা তৈরি হয়েছিল। ঈদের বাজারে তার মতো পোশাকের চাহিদা তৈরি হতো। অনেক পোশাক ব্যবসায়ীও সালমান শাহের সিনেমা দেখে নতুন ডিজাইনের পোশাক বাজারে আনতেন। সিনেমার প্রভাব যে সরাসরি ফ্যাশনশিল্পেও পড়তে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ ছিলেন তিনি।
সিনেমাসংশ্লিষ্টদের মতে, সালমান শাহের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ট্রেন্ড বুঝতে পারা। আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি এমন একটি ব্যক্তিগত স্টাইল তৈরি করেছিলেন, যা ছিল আধুনিক কিন্তু দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য। তার পোশাক কখনো অতিরঞ্জিত মনে হয়নি; বরং সহজেই অনুকরণযোগ্য ছিল।
তার মৃত্যুর পর ঢালিউডে জনপ্রিয়তার দিক থেকে অনেক নায়ক এসেছেন। রিয়াজ চেষ্টা করেছিলেন সালমান শাহকে ফলো করতে। কিন্তু তার ‘কপি অ্যান্ড পেস্ট’ সালমানভক্তরা গ্রহণ করেননি। অন্যদিকে ফেরদৌস তো ফ্যাশনের কোনো ধারই ধারেননি।
এদিকে শাকিব খান দীর্ঘ সময় দেশের সিনেমাশিল্পকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলা যায়। তবে তার জনপ্রিয়তা মূলত অভিনয় ও তারকাখ্যাতিনির্ভর; ফ্যাশন ট্রেন্ড তৈরির ক্ষেত্রে সালমান শাহের মতো প্রভাব তার ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। বর্তমান সময়ের অনেকেই সালমান শাহকে আইডল মেনে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন। তারাও অনেক ক্ষেত্রে ‘কপি পেস্ট’ করলেও সালমানের ধারে কাছেও পৌঁছাতে পারেননি। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে আলোচিত অন্য নায়ক-নায়িকারাও দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করলেও তাদের পোশাক বা স্টাইল সাধারণ মানুষের মধ্যে আলাদা ফ্যাশনধারা তৈরি করতে পারেনি। কেন?
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বর্তমানে সিনেমার প্রভাব আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। নব্বইয়ের দশকে সিনেমা ছিল বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। এখন দর্শক হলিউড, বলিউড, কোরিয়ান ড্রামা, ওয়েব সিরিজ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন ফ্যাশন ট্রেন্ডের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। ফলে একজন স্থানীয় তারকার পক্ষে এককভাবে ফ্যাশন বাজারে আধিপত্য তৈরি করা কঠিন।
দ্বিতীয়ত, ঢাকাই সিনেমায় দীর্ঘদিন ধরে চরিত্র নির্মাণের চেয়ে তারকাকেন্দ্রিক গল্প বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। চরিত্রের সঙ্গে মানানসই স্টাইলিং, কস্টিউম ডিজাইন কিংবা ফ্যাশন পরিকল্পনায় খুব কম বিনিয়োগ করা হয়েছে। অনেক সিনেমায় এখনো পোশাককে গল্প বলার অংশ হিসাবে নয়, বরং আনুষঙ্গিক বিষয় হিসাবে দেখা হয়।
তৃতীয়ত, আমাদের সিনেমা শিল্পে পেশাদার স্টাইলিস্ট ও ইমেজ কনসালট্যান্টের ব্যবহার এখনো সীমিত। আন্তর্জাতিক সিনেমা শিল্পে একজন তারকার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তৈরির জন্য আলাদা টিম কাজ করে। তারা পোশাক, চুলের স্টাইল, জনসমক্ষে উপস্থিতি, সবকিছু পরিকল্পনা করে। ঢালিউডে এ ধরনের চর্চা খুব কম দেখা যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগ। আগে দর্শকরা সিনেমার পর্দায় তারকাদের দেখতেন, ফলে তাদের স্টাইল নিয়ে রহস্য ও আকর্ষণ তৈরি হতো। এখন তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, দৈনন্দিন পোশাক ও ছবি সবসময়ই সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায়। ফলে কোনো নির্দিষ্ট স্টাইলকে কেন্দ্র করে আলাদা উন্মাদনা তৈরি হওয়ার সুযোগ কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাশন আইকন হয়ে ওঠার জন্য শুধু সুন্দর পোশাক পরলেই হয় না। প্রয়োজন নিজস্ব স্টাইল, ধারাবাহিকতা এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব। সালমান শাহ এ তিনটি গুণই একসঙ্গে ধারণ করেছিলেন। তিনি যে পোশাক পরতেন, তা শুধু সিনেমার অংশ ছিল না; তরুণদের জীবনধারার অংশ হয়ে উঠত।
বর্তমান প্রজন্মের নায়ক-নায়িকাদের মধ্যে ফ্যাশন সচেতনতার অভাব আছে, এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। তবে বাস্তবতা হলো, তারা এমন এক সময়ে কাজ করছেন যখন দর্শকের রুচি এবং ফ্যাশনের উৎস বহুমাত্রিক হয়ে গেছে। তবু সিনেমা যদি আবারও শক্তিশালী গল্প, আধুনিক উপস্থাপনা এবং পরিকল্পিত স্টাইলিংয়ের দিকে মনোযোগ দেয়, তাহলে নতুন কোনো ফ্যাশন আইকনের জন্ম হওয়া অসম্ভব নয়।
বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে সালমান শাহ শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক নন; তিনি একটি ফ্যাশন যুগের নাম। তার পোশাক, ব্যক্তিত্ব এবং স্টাইল আজও স্মৃতির অংশ হয়ে আছে। আর সেই কারণেই অনেকের কাছে প্রশ্নটি এখনো প্রাসঙ্গিক, ঢাকাই সিনেমা কি আরেকজন সত্যিকারের ফ্যাশন আইকনের অপেক্ষায় আছে?








