ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীনে ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি’র আওতায় দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুস-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন বাস্তবমুখী ট্রেডে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে মাত্র ১৫ দিনের একটি ‘কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন’ কোর্সে নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতি প্রশিক্ষণার্থীকে দেওয়া হচ্ছে ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা। আর এ বিপুল অঙ্কের সরকারি ভাতার লোভেই দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর একাংশকে জিম্মি করে একটি প্রভাবশালী দালালচক্র জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভোলা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ১৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, ড্রেস মেকিং, টেইলারিং ও বিউটিফিকেশন, ইলেকট্রিক্যাল, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, হেয়ার কাটিং, হস্তশিল্প, বেসিক ডাইভিং এবং মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ, এসি সার্ভিসিং ট্রেডে মোট ১১৩ জন প্রার্থী আবেদন করেন। এর মধ্যে সাতজন ইসলাম ধর্মের প্রার্থী ছিলেন আর বাকি প্রার্থীরা সবাই হিন্দু ধর্মের। প্রশিক্ষণে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৫ জনকে টিকানোর বিষয়টি সম্প্রতি জানাজানির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেলাজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে গত ১১ জুন প্রার্থীদের ভাইভা নেওয়া হয়। এর মধ্যে বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনে ২৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। পরে ১৬ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণকালীন প্রতিদিন নগদ ৫০০ টাকা ভাতা ও প্রশিক্ষণ শেষে ৫০ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়। ফলে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ শেষে ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা করে প্রদান করা হয়েছে। তবে যুগান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রশিক্ষণার্থীরা সবাই ভোলা সদর উপজেলার নিতাই চন্দ্র দাস ও লালমোহন উপজেলার তপন কুমারের আত্মীয়। এদের মধ্যে আপন ভাইবোনসহ একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিও রয়েছেন। সাধারণ অনগ্রসর জনগোষ্ঠী যাতে এ লোভনীয় ভাতার খোঁজ না পায়, সেজন্য বিজ্ঞপ্তিটি ব্যাপকভাবে প্রচার না করে গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক রজত শুভ্র সরকার যাতে গোপনে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে ঘুস নিতে পারেন সেজন্য বিশ্বস্ত দালাল নিয়োগ করেন। ওই দাদালচক্রকে তিনি অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা শিখিয়ে দেন। তার শিখিয়ে দেওয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ট্রেডে দালাল চক্রটি শুধু তাদের নিজস্ব লোকজনকে ফরম পূরণ করায়। ওই ট্রেডে আবেদন কম পড়ায় কোনোরকম প্রতিযোগিতা ছাড়াই ওই দালাল চক্রের আত্মীয়দের প্রশিক্ষণার্থী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করানো হয়। এরপর প্রশিক্ষণ শেষে পরিকল্পনা মোতাবেক প্রশিক্ষণার্থীদের কাছে থেকে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা আদায় করে দালাল চক্রের প্রধান নিতাই চন্দ্র দাস এবং তার সহযোগী তপন চন্দ্র ও ধীরেন চন্দ্র। সচেতন মহলের মতে, ১৫ দিনে কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের মতো বিষয়ে দক্ষতা অর্জন অসম্ভব। মূলত সাড়ে ৫৭ হাজার টাকার সরকারি বরাদ্দ দ্রুত পকেটস্থ করতেই এ ১৫ দিনের ‘প্রহসনমূলক’ প্রশিক্ষণের আয়োজন। অনুসন্ধানে হাতে আসা এক চাঞ্চল্যকর অডিও কথোপকথনে দেখা যায়, প্রশিক্ষণ শেষ হওয়া মাত্রই উপকারভোগীদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে কমিশন বা ঘুস দাবি করছে স্থানীয় দালাল চক্র। বরিশালে অবস্থানরত প্রশিক্ষণার্থী রত্না রানীর ওই কথোপকথনে রত্না স্বীকার করেন, তিনি ও তার ভাই তপন দুজনেই এ কম্পিউটার ট্রেনিং করেছেন। তিনি প্রশিক্ষণ ভাতা হিসাবে সর্বমোট ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা বুঝে পেয়েছেন। দালাল চক্রকে টাকা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রত্নার স্বামী সজল নেপথ্য থেকে বলেন, ‘১০ হাজার টাকার কথা বলছে স্যার। এই যে নেতা আছে, তারা সবাই ১০ হাজার টাকা কইরা নিতে আছে। নিতাই বাবু কইরা একজন আছে, সবার থেইকা ১০ হাজার নেছে। অলক, সজীব ওরা প্রশিক্ষণ করছে, ওরা ১০ হাজার কইরা দেছে।’ রত্না রানীও জানান, তিনি ধীরেন ভাইয়ের (মামা ধীরেন চন্দ্র দাস) মাধ্যমে এ প্রশিক্ষণে ঢুকেছেন এবং তাকেও ১০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে অন্যদের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। ঘুস ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের বিষয়ে রবিদাশ ফোরামের সভাপতি ও ভোলা জেলা সমাজসেবার উপপরিচালক রজত শুভ্র সরকারের বিশ্বস্ত দালাল চক্রের প্রধান নিতাই দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার সংগঠন থেকে ১৮ জন আবেদন করলেও এর মধ্যে মাত্র ছয়জন আছেন। তবে প্রশিক্ষণার্থীরা সবাই যে তার আত্মীয়স্বজন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা আমার দূরসম্পর্কের আত্মীয়। কিন্তু তাদের আমি টিকাই নাই।’ অন্যদিকে দালাদ চক্রের আরেক সদস্য লালমোহনের রবিদাশ ফোরামের সাবেক সভাপতি ধীরেন চন্দ্র দাস দাবি করেন, কেবল আবেদন ফরম জমার জন্য অফিশিয়াল ফি বাবদ ২০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিতরা তার আত্মীয়স্বজন কিন্তু তারা যোগ্যতাবলে এসেছেন। জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণার্থীদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রচারের জন্য উপজেলা, শহর কার্যালয় ও ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই ২৫ জনকে নেওয়া হয়েছে।’ ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান জানান, ‘ওই প্রশিক্ষণ কমিটির আমি সভাপতি ছিলাম। স্বচ্ছতার বিষয়ে আমি সমাজসেবা কর্মকর্তাকে একাধিকবার জিজ্ঞেস করছি, তিনি সব ঠিক আছে বলে আমাকে জানিয়েছেন। প্রশিক্ষণ শেষে সাংবাদিকের মাধ্যমে জানতে পেরেছি সমাজসেবার উপপরিচালকের অনিয়মের বিষয়টি। সেটি আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’