জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককাইনইবি) নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কুরুচিপূর্ণ, অশ্লীল ও যৌন হয়রানিমূলক পোস্ট, ভিডিও, ফটোকার্ড ও মন্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মর্যাদা, মানসিক নিরাপত্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১০টিরও বেশি ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত আইডি থেকে ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ করা হচ্ছে। পরে এসব পোস্ট বিভিন্ন ফেসবুক প্রোফাইলের মাধ্যমে আরো ছড়িয়ে পড়ে। একইসঙ্গে মন্তব্যের ঘরে অসংখ্য ব্যবহারকারী অশ্লীল, আপত্তিকর ও হয়রানিমূলক মন্তব্য করেন। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মর্যাদা, মানসিক নিরাপত্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।
২০২৬ সালের ১৮ জুন থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত ৩০ দিনে শুধু ‘আমাদের ত্রিশাল’ পেজ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ২৩টি পোস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পোস্টে মোট ৪ হাজার ৫৮৪টি রিঅ্যাক্ট এবং ৪৪৭টি মন্তব্য এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ১২টি পোস্ট ছিল নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে। এসব পোস্টের মন্তব্যের একটি অংশে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যৌন হয়রানিমূলক, অশালীন ও আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও আইডি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ‘আমাদের ত্রিশাল’ পেজ ও গ্রুপ, পেজটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মোস্তাকিম হাসানের আইডিসহ মানিক হোসেন আকন্দ, শাহীন আলম, মিলন ২০০২, কাউসার আলী ও আল রিফাতের আইডি এবং আরও অসংখ্য ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত আইডি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ, অশ্লীল ও আপত্তিকর পোস্ট, ভিডিও ও ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব পোস্টে তারা এবং আরও অসংখ্য ফেসবুক ব্যবহারকারী কুরুচিপূর্ণ, অশ্লীল ও হয়রানিমূলক মন্তব্য করেছেন।
ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, ঘটনার কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।“
তিনি দাবি করেন, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনার পরও তাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। এতে তিনি মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলেও উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “এই বিষয়ের যদি সুষ্ঠু সমাধান না হয়, তাহলে আমার জীবনের দায়ভার শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের থাকবে।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মাহবুবুর রহমান জোনি জানান, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পেজ ও আইডিগুলো শনাক্তকরণের কাজ চলছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি সাইবার পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
ত্রিশাল থানায় যোগাযোগ করলে থানা কর্তৃপক্ষ জানায়, “এ বিষয়ে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব। ত্রিশাল থানা এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে আসছে।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, “সাইবার বুলিংয়ের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে আইসিটি সেল ও প্রক্টরিয়াল বডিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের যেসব ফেসবুক পেজ থেকে এ ধরনের বুলিং করা হচ্ছে, সেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট যেসব পেজ বা গ্রুপ পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর অ্যাডমিন কারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন পোস্ট কেন অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। কোনো পোস্ট অনুমোদনের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই করা উচিত। আইসিটি সেলকে বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর তদারকি জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব অ্যাডমিনকে ডেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।”
ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী আহসান হাবীব বলেন, “সাইবার স্পেসে কাউকে যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে কোনো তথ্য, অডিও, ভিডিও, স্থিরচিত্র কিংবা এআই-নির্মিত বা সম্পাদিত (এডিটকৃত) তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, প্রচার বা প্রেরণ করা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুযায়ী এ অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এছাড়া এ ধরনের অপরাধ বাংলাদেশ দণ্ডবিধির বিভিন্ন বিধানের আওতায়ও শাস্তিযোগ্য।”
এ ধরনের সাইবার হয়রানিতে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।








