সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আঙ্গিক ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হলেও দুটিই শক্তিশালী গণমাধ্যম। উপগ্রহভিত্তিক টিভি চ্যানেলের প্রসার ঘটার আগপর্যন্ত সংবাদপত্রই ছিল প্রধান সংবাদমাধ্যম। এমনকি বিগত শতকে টেলিভিশনের বিপুল জনপ্রিয়তাও সংবাদপত্র বা মুদ্রিত গণমাধ্যমের সংহত অবস্থানকে নাড়াতে পারেনি। সে সময়ে টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের চেয়ে বিনোদনমাধ্যম হিসেবে বেশি সমাদৃত ছিল। সাম্প্রতিককালে অনেক ইলেকট্রনিক মিডিয়া ২৪ ঘণ্টা সংবাদ পরিবেশন করে মুদ্রিত গণমাধ্যমকে একধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। মানুষ কোন মাধ্যম থেকে খবরটি পেল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো, কত দ্রুত খবরটি পাওয়া গেল। ইলেকট্রনিক মিডিয়া সেই কাজ নিঃসন্দেহে দ্রুত করতে পারছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, বিশ্বব্যাপী সংবাদপত্র বা মুদ্রিত গণমাধ্যমের মন্দা চলছে। বিশেষ করে উন্নত পশ্চিমা বিশ্বে অনেক নামকরা পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। দুটি পত্রিকা একীভূত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিখ্যাত সাপ্তাহিক ‘নিউজউইক’-এর মুদ্রণ সংস্করণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক খ্যাতনামা পত্রিকার প্রচারসংখ্যা কমে গেছে। এই প্রচারসংখ্যার সঙ্গে বিজ্ঞাপন বা ব্যবসার সম্পর্কটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পত্রিকা একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্যও বটে। পাঠকের চাহিদা কমে গেলে এর বিক্রি কমে যায়। আর বিক্রি কমে গেলে আয়ের প্রধান উৎস বিজ্ঞাপনও কমে যায়। মুদ্রিত দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় পরদিন, আর বৈদ্যুতিন মাধ্যম প্রতি ঘণ্টায় এমনকি মিনিটে মিনিটে হালনাগাদ খবর পরিবেশন করে থাকে। যদিও দৈনিক সংবাদপত্রগুলো অনলাইনে ঘটনার পরপরই পাঠকের কাছে খবরটি পৌঁছে দিচ্ছে।
আনন্দের কথা, সাম্প্রতিক একাধিক জরিপ জানাচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পত্রিকার পাঠক কমে গেলেও এশিয়ায় পাঠক তেমন কমেনি। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ২০ থেকে ২৫ বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যা কমলেও বাজার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে।
দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ অনেক বেশি রাজনীতিসচেতন। একজন রাজনীতিসচেতন মানুষের জন্য শুধু তথ্য পাওয়াই যথেষ্ট নয়; তথ্যের সঙ্গে তিনি বিশ্লেষণও পেতে চান। অন্যের ভাবনার সঙ্গে নিজের ভাবনাকে মিলিয়ে নিতে চান। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের অর্থনীতি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। শিক্ষার হার বাড়ছে। সেই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, বেড়েছে জীবনযাপনের চাহিদাও। সে কারণে একজন পাঠক শুধু দেশ-বিদেশের খবর জানতেই পত্রিকা পড়েন না, তিনি তাঁর দৈনন্দিন চাহিদা ও প্রয়োজনের বিষয়টিও পত্রিকায় পেতে চান, যা বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সব সময় সম্ভব হয় না।
দুই
বাংলাদেশে বর্তমানে ৩০টির বেশি টিভি চ্যানেল থাকলেও এর অভিগম্যতা কয়েকটি বড় শহর ও আশপাশের এলাকাতেই সীমিত। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার বৃহত্তর দর্শক-শ্রোতার ভরসা হতে পারত। কিন্তু এই দুটি প্রতিষ্ঠান সরকারি নীতিগত দুর্বলতার কারণে দর্শক-শ্রোতার চাহিদা মেটাতে পারছে না। সম্প্রতি বেসরকারি পর্যায়ে কয়েকটি এফএম রেডিও চালু হলেও তা মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে যেতে পারেনি। সে ক্ষেত্রে এখনো বিশাল জনগোষ্ঠী সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টালকে তথ্য পাওয়ার প্রধান মাধ্যম বলে মনে করে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো দেখা গেলেও বিশাল জনগোষ্ঠী বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে দৈনিক, সাপ্তাহিক মিলে পত্রিকার মোট প্রচারসংখ্যা ২০ লাখের বেশি নয়। অথচ প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ লাখ শিক্ষিত তরুণ যুক্ত হচ্ছে। তাদের সবার হাতে এখনো পত্রিকা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে সামর্থ্যের অভাবে পত্রিকা কিনতে পারছে না, যে হারে মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বাড়ছে, সেই হারে পত্রিকার পাঠক বাড়েনি। অর্থাৎ পত্রিকার পাঠক বাড়ানোর সুযোগ আছে। বাংলাদেশের পত্রপত্রিকাগুলো সনাতনি ধারায় পত্রিকার বিপণন করে থাকে; এখানে আধুনিক বিপণনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে পাঠকসংখ্যা দ্বিগুণ করা সম্ভব।
পৃথিবীর কোনো দেশে আমাদের দেশের মতো এত বিপুলসংখ্যক জাতীয় দৈনিক প্রকাশিত হয় না; প্রকাশিত হয় আঞ্চলিক দৈনিক। অধুনা বাংলাদেশেও বেশ কিছু আঞ্চলিক দৈনিক পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
আরেকটি কথা, বাংলাদেশের মতো বিকাশমান সমাজে সংবাদপত্রগুলো শুধু সংবাদই পরিবেশন করে না; দেশের ও বহির্বিশ্বের রাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি, কৃষি, পরিবেশসহ বিচিত্র বিষয়ে পাঠকের সঙ্গে মতের আদান-প্রদান করে। মানুষের মনের ও চিন্তার খোরাক জোগায়। পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ জনমত গঠনে বিশাল ভূমিকা পালন করে। বৈদ্যুতিন মাধ্যমগুলো তাৎক্ষণিকতা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাদের পক্ষে অনেক সময় সেসব করা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া অনুসন্ধিৎসু পাঠক দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে টেলিভিশনে যে খবর দেখেন, সেই খবরের বিস্তারিত কিংবা খবরের পেছনের খবর দেখতে চান পত্রিকার পাতায়। এ কারণে সংবাদপত্রকে তার সংবাদ পরিবেশনা এবং বিশ্লেষণের ধরন পাল্টাতে হবে।
লেখক: সম্পাদক, চরচা








