তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জলভাগে ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করার পর এবার স্থলভাগ ইজারা দিতে একটি মডেল উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) চূড়ান্ত করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্বে আসার ১৮০ দিনের মধ্যে এই দরপত্র আহ্বানের লক্ষ্য সামনে রেখে খসড়া মডেল পিএসসি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব আজকের পত্রিকাকে বলেন, স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে একটি মডেল পিএসসি প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেটি এখন ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সেখান থেকে ফিরে এলেই তা মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বানের বিষয়টি ছিল। এরই মধ্যে অফশোর বা সমুদ্রে ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অচিরে যাতে স্থলভাগেও দরপত্র আহ্বান করা যায়, সে জন্যই তড়িঘড়ি প্রস্তুতি চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের পর স্থলভাগে ব্লক বরাদ্দে কোনো আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি ইউনোকলের মালিকানা কিনে নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন এখন দেশের সর্ববৃহৎ গ্যাস উত্তোলন কোম্পানি। স্থলভাগের ব্লক-১২, ১৩ ও ১৪-তে দেশের প্রধান তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা করছে শেভরন। মোট দেশীয় উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে শেভরনের মাধ্যমে। আর রাষ্ট্রায়ত্ত বাপেক্সের হয়ে বিভিন্ন কূপ খননে যুক্ত হয় রাশিয়ার কোম্পানি গাজপ্রম। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্রিসএনার্জি ৯ নম্বর ব্লকে বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (পিএসসি) মোহাম্মদ শোয়েব আজকের পত্রিকাকে বলেন, সম্প্রতি অফশোর মডেল পিএসসির আলোকে সমুদ্রে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ভূ-ভাগে ২১টি ব্লকের মধ্যে কয়েকটি থেকে এখন গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। বাকি ব্লকগুলোতে ঠিকাদার নিয়োগে নতুন একটি মডেল পিএসসি চূড়ান্ত হওয়ার পথে।
স্থলভাগের পিএসসিতে কী পরিবর্তন থাকছে জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, চূড়ান্ত হওয়ার আগে এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে খসড়ায় অফশোর পিএসসি থেকে গ্যাসের মূল্য, লভ্যাংশ ভাগাভাগি—এসব ক্ষেত্রে আইওসিগুলোর সুবিধা একটু কমানো হয়েছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, অনশোরের মডেল পিএসসিতে ব্র্যান্ড ক্রডের ৮ শতাংশ ধরে গ্যাসের দাম ঠিক করা হয়েছে। সাগরে পাইপলাইন নির্মাণ ও সঞ্চালন চার্জ ধরা হলেও স্থলভাগে সেই সুযোগ নেই। অফশোরে কূপ খননের জন্য ৯ বছর সময় রাখা হলেও অনশোরে তা ৭ বছর করা হবে। প্রথম তিন বছরের মধ্যে ‘সাইসমিক জরিপ’ শেষ করতে হবে। বাকি ৪ বছরে সংশ্লিষ্ট আইওসিকে কূপ খননসহ অন্যান্য কাজ শেষ করতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের এমন উদ্যোগ অনেক আগে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। দেরিতে হলেও এমন উদ্যোগ ইতিবাচক। কাছাকাছি সময়ে সাগরে অনুসন্ধানের জন্য একটি দরপত্র খোলা হয়েছে। কিছুটা পার্থক্য থাকলেও দুই পিএসসির মধ্যে অনেক কিছুই মিল থাকবে।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, পুরো দেশই বিডিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা যায়। বাপেক্সে যেসব স্থান ফেন্স আউট করছে, সেগুলো যদি তারা ড্রিলিংয়ে না যায়, তাহলে তা আইওসির (আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি) জন্য ছেড়ে দিতে পারে অথবা অন্যদের সঙ্গে যৌথভাবে করতে পারে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, মডেল পিএসসিতে গ্যাসের মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২০০৮ সালের পর থেকে উত্তরোত্তর বাড়ানো হয়। ফলে দেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে আইওসির স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। এবারের পিএসসিতে গ্যাসের বেঞ্চমার্ক প্রাইস কত হচ্ছে, সেটার ন্যায্যতা এবং যৌক্তিকতা যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হবে বলে আশা করি। এমনকি গ্যাসের এই মূল্য জনগণের কাছে উপস্থাপন করে তাদের মতামত নেওয়া জরুরি।








