সংবিধান ‘সংশোধন’ নাকি ‘সংস্কার’ এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী জোটের রাজনৈতিক দূরত্ব আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জুলাই সনদের সাংবিধানিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিলেও তাতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। ফলে সংবিধান নিয়ে দুই পক্ষের মৌলিক মতপার্থক্য এখন রাজনৈতিক অচলাবস্থার রূপ নিয়েছে।
সরকারের উদ্যোগ অনুযায়ী, সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৬ বিধির আওতায় ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও ১২ সদস্যের কমিটি করা হয় হয়। কমিটির দায়িত্ব হবে- জুলাই সনদের আলোকে প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনী বিলের খসড়া প্রস্তুত করে সংসদে সুপারিশ করা। তবে, বিরোধী দলগুলোর দাবি, গণভোটে জনগণ সংবিধানের সাধারণ সংশোধনের নয়, মৌলিক সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। তাই সংশোধন কমিটির পরিবর্তে আগে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে।
এমন অবস্থায় সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াই থমকে আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশন শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। সংবিধান বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধানের মতো মৌলিক বিষয়ে সর্বদলীয় ঐকমত্য ছাড়া গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব নয়।
গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিশেষ কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, সরকারি দলের সাতজন সদস্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি সদস্যদের মধ্যে বিরোধী দল, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে নাম চাওয়া হয়েছে।
সংসদে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “কমিটি গঠনের সব প্রস্তুতি রয়েছে। সংসদে প্রতিনিধিত্বের অনুপাত বিবেচনায় রেখে সব ধারার রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। বিরোধী দলগুলোর কাছ থেকে প্রতিনিধি তালিকা পেলেই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।”
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জুলাই সনদের সাংবিধানিক বিষয় বাস্তবায়নের একমাত্র কার্যকর পথ হলো সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন।
গত ১ এপ্রিল সর্বদলীয় বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়েই সংবিধান সংশোধনের কাজ করতে চায়। সে লক্ষ্যেই বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিও বলেন, “সংস্কার যা হওয়ার হয়েছে, এখন হবে সংবিধান সংশোধন। জুলাই সনদের সুপারিশগুলোকে সাংবিধানিক রূপ দিতে সংসদীয় সংশোধনের বিকল্প নেই।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলগুলোও আলোচনায় অংশ নেবে।
সংস্কার পরিষদের দাবিতে অনড় বিরোধী জোট
অন্যদিকে, সরকারের এই অবস্থান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের নেতৃত্বাধীন জোট।
সংসদে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি শুধু সংবিধান সংশোধনের নয়, জনগণ গণভোটে মৌলিক সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। তাই সেই গণরায় উপেক্ষা করে কেবল সংশোধনের উদ্যোগ জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সরকার যদি গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে, তাহলে বিষয়টির ফয়সালা রাজপথেই হবে।” একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে জামায়াত কোনো প্রতিনিধি দেবে না।
একই অবস্থান নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “গণভোটের রায় অনুযায়ী সরকারের প্রথম দায়িত্ব ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা। সেই বাধ্যবাধকতা পূরণ না করে সংশোধন কমিটি গঠন করা হলে সেখানে এনসিপির কোনো প্রতিনিধি থাকবে না।”
সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার নিয়ে মার্চের শেষ সপ্তাহে সংসদে দীর্ঘ বিতর্ক হয়। সরকার বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে এগোতে চাইলেও বিরোধী দল সংস্কার পরিষদ গঠন এবং সমান প্রতিনিধিত্বের দাবি তোলে। পরে এ ইস্যুতে বিরোধী দল ওয়াকআউটও করে। এরপর সরকার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিলেও বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধি না পাওয়ায় কমিটি গঠন আর এগোয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু কেবল সংশোধন ও ‘সংস্কার’ শব্দের পার্থক্য নয়; বরং গণভোটের রায়ের ব্যাখ্যা এবং তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েই মূল মতভেদ।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেছেন, “সংবিধান ‘সংশোধন’ নাকি ‘সংস্কার’ এ বিতর্কের চূড়ান্ত সমাধান রাজনৈতিকভাবেই হতে হবে এবং এর সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা সংসদ। সাম্প্রতিক এক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট পুনর্বহালের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না দিয়ে বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, “বর্তমান সংবিধানের অধীনে সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংশোধন আনতে পারে। তবে, সংবিধানের মতো মৌলিক বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ঐকমত্যে পৌঁছানোই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও টেকসই সমাধান। বিরোধী দলের অংশগ্রহণ থাকলে এ প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে।”
জাতীয় সংসদের সাবেক কর্মকর্তা মো. সানাউল হক বলেন, “সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব দ্রুত কমানো না গেলে শুধু ১৭ সদস্যের বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনই নয়, জুলাই সনদের সাংবিধানিক বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াও দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।”








