সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বণ্টন নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।

বিরোধী দল জানিয়েছে, কোনো কমিটির সভাপতির পদ পাওয়ার শর্তে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তাদের সম্মতি নেই। সরকার বলছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

রবিবার (৩০ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হয়। বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হওয়া অধিবেশন রাত সোয়া ৮টা পর্যন্ত চলে। প্রথম অংশে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। পরে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

মাগরিবের বিরতির পর সংসদীয় কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কার্যক্রম শুরু হলে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি জানান, ‍বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে সদস্য দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।

বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বিষয়টি পরিষ্কার করে জানান, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তাদের কোনো সম্মতি হয়নি। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু সেটিকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার সঙ্গে শর্ত হিসেবে যুক্ত করার বিষয়ে তারা সম্মতি দেননি।

সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের জানান, সংসদে তাদের সদস্যসংখ্যার অনুপাতে প্রায় ২৬ শতাংশ স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ পাওয়ার কথা। একইভাবে কমিটিগুলোর সভাপতির পদেও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব প্রত্যাশা করেছিল বিরোধী দল। কিন্তু, এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে বিরোধী দলের কাউকে সভাপতি করা হয়নি।

তিনি বলেন, “সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আমরা যাব এবং সেই হিসেবে আপনারা আমাদের সভাপতি দেবেন এমন কথা আমরা কখনো বলিনি।” 

বিরোধীদলীয় এই নেতা জানান, তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ না নেওয়া।

বিরোধী দলীয় উপনেতা অতীত সংসদের নানা ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে জানান, তারা সংসদকে পুরোনো সংঘাতের রাজনীতিতে ফিরিয়ে নিতে চান না। 

স্পিকারকে মারধর, ডেপুটি স্পিকার হত্যাসহ অতীতের বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করে সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের জানান, বৈষম্যবিরোধী এই সংসদে তারা তাদের ন্যায্য অধিকার চান।

এর জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেন, “গত ৫৪-৫৫ বছরে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি ছাড়া অন্য কোনো সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার রেওয়াজ নেই। এরপরও সরকার আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে ১০টি কমিটির সভাপতির পদ দিতে রাজি।”

তিনি বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন করা হবে। বিরোধী দল সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে তাদের কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার বিষয়ে সরকার আগ্রহী।”

পরে বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে বিভিন্ন দাবি জানানো হলেও সেটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করলে বিষয়টি পরস্পরবিরোধী হয়ে যায়।”

তিনি বলেন, “সংবিধান সংশোধনের জন্য কার্যপ্রণালী বিধির ২২৬ বিধি অনুযায়ী বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ রাখা হয়েছে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদেরও কমিটিতে রাখা হয়েছে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কমিটির একটি বৈঠক ইতোমধ্যে হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে। এসব মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করে পরে আইন মন্ত্রণালয় ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদের পাশাপাশি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার, জনগণের প্রত্যাশা এবং বিভিন্ন পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

বিরোধী দলকে কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সেখানে তাদের সব বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা হবে এবং তাদের মতামতও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিরোধী দল যখনই অংশ নিতে চাইবে, তাদের স্বাগত জানানো হবে।”

এর আগে ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার বিষয়েও বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অপেক্ষা না করে তখনই কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে, বিরোধী দল সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি।”

এদিকে, একই অধিবেশনে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল, পর্যটন মহাপরিকল্পনা, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, ই-কমার্সে গ্রাহকের পাওনা, ভূমি অফিসের দুর্নীতি, সার সরবরাহ এবং দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়েও আলোচনা হয়।

থার্ড টার্মিনালের কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত ৯০২ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে সংসদকে জানান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি বলেন, “এই অর্থ অনুমোদন না হলে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো পুরোপুরি সচল করা সম্ভব হবে না।”

অন্যদিকে, দেশের সম্ভাবনাময় প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন স্থান নিয়ে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান পর্যটনমন্ত্রী।

ই-কমার্স খাতে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের তথ্য তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ৫৮ হাজার ৭২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।

দেশের চাহিদা অনুযায়ী সারের কোনো ঘাটতি নেই বলে সংসদকে জানান কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। আর চোরা শিকার, বন উজাড়, নগরায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ থেকে গত কয়েকশ বছরে ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে বলে জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।