বিগত আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যেসব পরিবর্তন এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছিল তা পরিবর্তন না করা পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ত্রয়োদশ সংশোধনী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হচ্ছে না। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেও এর কাঠামো কি হবে-এ বিষয়ে জানতে সংবিধান ও মামলাসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে। তারা বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পূর্বের অবস্থায় ফেরাতে হলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হাতে পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। পূর্ণাঙ্গ রায় দেখে রিভিউর (পুনর্বিবেচনা) বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। জাতীয় সংসদে সংবিধানের ধারাগুলোতে সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে সরকার সেদিকে যাবে কিনা, নাকি অন্য কোনো নতুন কাঠামোতে সংশোধনী আনবে-এ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। বিএনপির ৩১ দফায়ও একটি নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করার কথা উল্লেখ আছে।
আইনজীবীরা জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফেরাতে হলে পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৯৯, ১২৩, ১৪৭, ১৫২ এবং তৃতীয় তফসিলে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা সংশোধন করতে হবে। পঞ্চদশ সংশোধনী সংবিধানের ৯৯(১) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিধান করা হয়েছিল, ‘অবসরের পর বিচারকরা প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।’ আপিল বিভাগের হাইকোর্টের রায় বহাল রাখায় সংসদে ৯৯(১) অনুচ্ছেদ সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নিতে পারবেন না। অথচ ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহালে ৫৮(২-ক) অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হবেন।
ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১২৩(৩-ক) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ‘নির্বাচন হবে সংসদের মেয়াদ পূরণের আগের ৯০ দিনের মধ্যে’-এমন বিধান করা হয়। এ বিধান সংশোধন না করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে সংসদ বহাল থাকা অবস্থায়। পঞ্চদশ সংশোধনীর মামলায় আপিলকারীদের আইনজীবীরা আদালতের সামনে এই যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তারা পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে বলেছিলেন।
রিটকারী সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ের পর পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে লিভ টু আপিল করেছিলাম। আপিল বিভাগ সেটি খারিজ করে হাইকোর্টের রায় পুনর্বহাল করেন। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে জটিলতা এখনো রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। আর পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১২৩(৩-ক) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিধান করা হয়েছে, নির্বাচন হবে সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে। এই বিধান সংশোধন না করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে সংসদ বহাল থাকা অবস্থায়।
বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহালে ৫৮(২-ক) অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হবেন। আর পঞ্চদশ সংশোধনী সংবিধানের ৯৯(১) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিধান করা হয়, অবসরের পর বিচারকরা প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না। আপিল বিভাগের হাইকোর্টের রায় বহাল রাখায় সংসদে ৯৯(১) অনুচ্ছেদ সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নিতে পারবেন না। পঞ্চদশ সংশোধনীর মামলায় আপিলকারীদের আইনজীবীরা আদালতের সামনে এই যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে বলেছিলেন। আপিল বিভাগ তা গ্রহণ করেননি। আমাদের কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। এখন আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং পর্যবেক্ষণ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর জানা যাবে। রায় দেখে আমরা রিভিউর (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করব।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, সংশোধনীতে সংবিধানের যেসব পরিবর্তন এনেছিল, এর কয়েকটি ধারা পরিবর্তন না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ত্রয়োদশ সংশোধনী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হবে না। এটা এখন সম্পূর্ণ জাতীয় সংসদের এখতিয়ার। সংসদ থেকেই এর একটা স্থায়ী সমাধান আসতে পারে। কারণ সংসদই একমাত্র আইন প্রণয়নের উত্তম জায়গা।
পঞ্চদশ সংশোধনীর রিটকারী আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে লিভ টু আপিল করেছিলাম। কিন্তু আদালত সেটি বাতিল করেননি। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেও এর কাঠামো কি হবে এ নিয়ে কিছু জটিলতা রয়ে গেছে। ত্রয়োদশ সংশোধনী মতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরতে হলে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু ধারা বাতিল করতে হবে। বিষয়টি শুনানির সময় আদালতের নজরে এনেছিলাম, কিন্তু আদালত তা গ্রহণ করেননি। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আমরা রিভিউর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। জাতীয় সংসদে আইনের সংশোধনীসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন এমপি। তিনি শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পূর্বের অবস্থায় ফিরবে কিনা, সেটা জাতীয় সংসদ সিদ্ধান্ত নেবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জাতীয় সংসদে শিগগিরই সংশোধনী আনা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশেষ কমিটি কাজ করছে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পাশাপাশি সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের দায়ের করা একটি রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। ওই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরার পথ তৈরি হয়। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রিটকারীপক্ষ। তাদের মতে, আংশিক বাতিলের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সম্পূর্ণ কার্যকর হয়নি এবং প্রধান উপদেষ্টার শপথের বিধানটি ফিরে আসেনি। বৃহস্পতিবার সেই আপিল প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ খারিজ করে দেন।
ত্রয়োদশ সংশোধনীতে কাঠামো কি ছিল : ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য একটি ধাপভিত্তিক বিকল্প কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রথম বিকল্প ছিল, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি; দ্বিতীয়ত, তার আগের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি; তৃতীয়ত, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি; চতুর্থত, তার আগের আপিল বিভাগের বিচারপতি; পঞ্চমত, রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় যোগ্য নাগরিক এবং ষষ্ঠত, রাষ্ট্রপতি নিজেই।
আওয়ামী লীগ সরকারের চাওয়া মতো এক রিটকারীর আবেদনের প্রেক্ষিতে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন ৭ সদস্যের আপিল বিভাগ (৪:৩) ২০১১ সালের ১০ মে এক রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেন। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কবর রচিত হয়।








