বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের এক গৌরবময় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় রচিত হলো সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক রায়ের মধ্য দিয়ে। ২০১১ সালের বহুল বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চের এই সিদ্ধান্ত কেবল আইনি বিজয়ই নয়, বরং এটি জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত আকাঙ্ক্ষার এক সাংবিধানিক স্বীকৃতিও বটে। এর ফলে দেশে দীর্ঘকাল ধরে অবরুদ্ধ থাকা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত প্রকাশের মাধ্যম ‘গণভোট’ ব্যবস্থাও পুনরায় সংবিধানে ফিরে আসার পথ সুগম হয়েছে।
আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে সুপরিকল্পিতভাবে দলীয়করণের এক নগ্ন চেষ্টা। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়েও উঠে এসেছে, এই ব্যবস্থা বাতিলের কারণে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রহসনমূলক ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পথ সুগম হয়েছিল, যা নাগরিকদের ভোটাধিকারকে সরাসরি হরণ করে। বলা বাহুল্য, কোনো দেশের সংবিধানে যদি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে তার ‘গণতন্ত্র’ ও ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব’ নামক মৌলিক কাঠামো দুটি ধূলিসাৎ হতে বাধ্য। বিগত দেড় দশক ধরে জনগণ এই দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়েই জীবন অতিবাহিত করেছে, যার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে।
বলা বাহুল্য, আইনমন্ত্রী এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ও আইনি প্রক্রিয়ায় রায় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি এই ইঙ্গিত দেয় যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটি ক্ষমতার মসনদ দখলের নোংরা রাজনৈতিক খেলা বন্ধ করতে এবং জনগণের ভোটের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসাবে কাজ করবে। তবে এই রায়ের অপর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, আদালত পুরো পঞ্চদশ সংশোধনীকে ঢালাওভাবে বাতিল করেননি। হাইকোর্ট যে চারটি প্রধান বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন-যেমন সংবিধানে অপরিবর্তনীয় অনুচ্ছেদ যুক্ত করা (৭ক ও ৭খ), গণভোট বাতিল, নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপ-কেবল সেগুলোকেই আপিল বিভাগ অবৈধ রেখেছেন। এর বাইরে থাকা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জনগণের নির্বাচিত জাতীয় সংসদের ওপর।
আমরা মনে করি, আদালতের এই বিচক্ষণ ভারসাম্যমূলক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দূরদর্শী ও প্রশংসনীয়। এর মাধ্যমে যেমন একদিকে পূর্ববর্তী সরকারের একতরফা সংশোধনীর কালো থাবা থেকে সংবিধান রক্ষা পেয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সংসদের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ইচ্ছার প্রতিও পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। এখন রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হবে আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়কে বাস্তবায়ন করা। এজন্য একটি কার্যকর ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’ গঠন করে অতি দ্রুত নির্বাচনি কাঠামোর সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে, যাতে কোনো অশুভ শক্তি আর কখনো দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দুঃসাহস দেখাতে না পারে। সুশাসন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক এক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে এ রায় নিশ্চয়ই এক আলোকবর্তিকা হিসাবে পথ দেখাবে।








