দেশের রাজনীতিতে নতুন করে দুটি ইস্যু সামনে এসেছে। একটি হলো একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান এবং অন্যটি বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের দুর্নীতি ও লুটপাটের তদন্তে ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশের দাবি। রোববার জাতীয় সংসদে বিএনপির শীর্ষ দুই নেতার তোলা এ দুই ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যেও এ ঘটনায় তৈরি হয়েছে নানামুখী প্রতিক্রিয়া। তারা বলছেন, ইতিহাসের দায়মুক্তি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে জামায়াতের যেমন নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া উচিত; পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের সব কর্মকাণ্ডেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। এদিকে দুর্নীতির ব্যাপারে জামায়াত কঠোর অবস্থান দেখালেও মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে মুখ খুলছেন না দলটির নেতারা। তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় বিএনপি-জামায়াতের জোট থাকলেও তখন জামায়াতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়নি। এখন সরকারে থেকে প্রধান বিরোধী দলের ব্যাপারে এমন মন্তব্য বেমানান।
সংসদে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান পরিষ্কার করতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য জামায়াতের ক্ষমাপ্রার্থনা করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, সেটার জন্য এখনো সময় আছে। এটা স্বীকার করে নিলে তাদের রাজনীতি করা সহজ হয়ে যাবে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট ও অর্থ পাচারের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সব কর্মকাণ্ড দুদকের মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশ দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বর্তমান সরকারের ভিত্তি স্বচ্ছতা-এমনটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর একটি অস্থির সময় ছিল। যমুনার (অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন) অভ্যন্তরে এবং যমুনার কিনারে কী পরিস্থিতি ছিল, এটা সবাই জানেন।
সংসদে দুই মন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় একজন সিনিয়র মন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ সোমবার যুগান্তরকে জানান, ‘তার বাবা স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকায় ছিলেন বলে অভিযোগ আছে। তার বাবা কি ক্ষমা চেয়েছেন? না চাইলে মরহুম বাবার পক্ষে আগে তিনি ক্ষমা চাইতে পারেন। দ্বিতীয়ত, যাদের সঙ্গে দীর্ঘ বছর একসঙ্গে জোট করলেন, আন্দোলন-সংগ্রাম করলেন, তখন তিনি এ প্রশ্ন তো তোলেননি। এখন সরকারে আছেন বলেই প্রধান বিরোধী দলের ব্যাপারে তার এই বক্তব্য মানায় না। তিনি বলেন, বিভাজন জাতির জন্য ভালো নয়, বরং সবাই মিলে দেশের স্বার্থে কাজ করাটাই জরুরি। এভাবে যদি বিএনপি আবারও পুরোনো ন্যারেটিভ দিয়ে আমাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে, তাহলে আবার ফ্যাসিবাদ আসবে। আমরা মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি এবেং তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
অবশ্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুর্নীতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তদন্তের দাবির বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, দুর্নীতির ব্যাপারে আমরা আপসহীন। পাশাপাশি বর্তমানে যেসব দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি হচ্ছে, তারও তদন্ত হওয়া দরকার।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুর্নীতি তদন্তের দাবির বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য যদি আন্তরিক হয়, তবে তদন্ত করা উচিত। তবে সংসদে হালকা কথা বলার অভ্যাস থাকলে চলবে না।
জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া প্রসঙ্গে মান্না বলেন, ব্যক্তিগত ও দলগতভাবে আমি মনে করি জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া উচিত। তবে বিএনপি দীর্ঘদিন জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে রাজনীতি করেছে; তখন এই কথা বলেনি। এখন হঠাৎ একে বড় ইস্যু বানানো ঠিক নয়। এ প্রক্রিয়াটি ধারাবাহিকভাবে হওয়া দরকার।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ও দুর্নীতির তদন্ত প্রসঙ্গে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, এটা আমাদের দীর্ঘদিনের দাবিরই প্রতিফলন। বিগত ১৮ মাসে কোনো জবাবদিহি না থাকায় ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লুটপাট হয়েছে। এমনকি অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় অংশও রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে ‘গনিমতের মাল’ হিসাবে ব্যবহার করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। বিজনেস কমিউনিটি, হাউজিং সেক্টর, ঠিকাদারি, তদবির ও পদায়নের মাধ্যমে এই বিপুল অপতৎপরতা চালানো হয়েছে। কোনো প্রতিশোধ বা হিংসাবিদ্বেষ থেকে নয়, বরং মানুষের আমানতের এই খেয়ানতের একটি নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত তদন্ত হওয়া জরুরি। আমরা চাই সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ‘শ্বেতপত্র’ তৈরি করুক, যা পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হবে।
জামায়াতের ক্ষমা প্রসঙ্গে সাইফুল হক বলেন, ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও জামায়াতে ইসলামী এখনো দেশের মানুষের কাছে তাদের অতীত ভূমিকার জন্য ক্ষমা চায়নি বা অনুশোচনা প্রকাশ করেনি। বর্তমান প্রজন্মের যে তরুণ নেতারা জামায়াতে আছেন, তাদের অধিকাংশেরই মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অপরাধের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। তাই জামায়াতের তৎকালীন নেতাদের অপরাধের দায় কেন বর্তমান প্রজন্ম ঘাড়ে নিয়ে ঘুরবে?
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর নেতিবাচক ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় প্রমাণিত। তারা কেবল স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধিতাই করেনি বরং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসাবে এদেশে গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করেছে।
তিনি বলেন, ওই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর সেই ভূমিকা নিয়ে যদি বর্তমানে তাদের কোনো উপলব্ধি তৈরি হয়ে থাকে, তবে তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা উচিত। রাজনৈতিকভাবে জোর-জুলুম করে কাউকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা সমীচীন নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ প্রসঙ্গে রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, রাষ্ট্রে সুশাসন ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো মেয়াদের কর্মকাণ্ডের একটি ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশ করা জরুরি। ওই সময়ে যত ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া প্রসঙ্গে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে দুর্নীতি তদন্ত প্রসঙ্গে যুগান্তরকে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়সহ যে কোনো দলেরই হোক, দুর্নীতির বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত। বরং আমরা দেখেছি, অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপির কথামতোই সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে। সবচেয়ে বড় দুর্নীতি হচ্ছে নির্বাচনি ফলাফলের কারচুপি; যার প্রতিদানে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে।








