গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সংসদ হলো জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, অধিকার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ কেন্দ্র। একটি দেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা কতটা সুদৃঢ়, তা অনেকাংশেই প্রতিফলিত হয় সংসদের ভেতরের পরিবেশের ওপর। কিন্তু আমাদের সংসদীয় ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি, বিষোদ্গার, হই-হট্টগোল আর ব্যক্তিগত আক্রমণ একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। এ ধূসর বাস্তবতার মধ্যে সোমবার সন্ধ্যায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষে যে ইতিবাচক দৃশ্যপট দেখা গেল, তা দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে। অধিবেশন শেষে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমান নিজ আসন থেকে ওঠার সময় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যেভাবে এগিয়ে গেলেন, করমর্দন করলেন এবং একে অপরের কুশল বিনিময় করে দীর্ঘক্ষণ হাসিমুখে কথা বললেন, তা কেবল একটি সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তনের এক শক্তিশালী বার্তা।
অচলায়তন ভাঙার এক অনন্য মুহূর্ত
সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্পর্ক চিরকালই দ্বান্দ্বিক, তবে তা শত্রুতামূলক হওয়া সমীচীন নয়। সোমবার সন্ধ্যার ঘটনাটি এ সত্যটিকেই পুনরুজ্জীবিত করেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভেদ, দূরত্ব ও পারস্পরিক অনাস্থার প্রাচীর ভেঙে যখন দেশের শীর্ষ দুই নেতা হাসিমুখে করমর্দন করেন, তখন তা সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি এনে দেয়। শুধু দুই শীর্ষ নেতাই নন, বিরোধী দলের অন্য সংসদ-সদস্যরাও যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কুশল বিনিময়ে অংশ নিয়েছেন, তা এক অভূতপূর্ব সৌহার্দের আবহ তৈরি করেছে। যেখানে সাধারণত সংসদ মানেই বিরোধী দলের ওয়াকআউট, সরকারি দলের একতরফা বক্তব্য কিংবা টেবিল চাপড়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা-সেখানে এ ধরনের সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি প্রমাণ করে, তীব্র আদর্শিক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরে সৌজন্য ও শিষ্টাচার বজায় রাখা সম্ভব।
সংসদীয় শিষ্টাচার ও সুস্থ রাজনীতির গুরুত্ব
একটি কার্যকর সংসদের জন্য সংসদীয় শিষ্টাচার অপরিহার্য। সংসদ কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়, এটি হলো যুক্তি, তর্ক এবং জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি পবিত্র স্থান। অতীতে অনেক সময়ই দেখা গেছে, সংসদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে একে অপরের প্রতি বিষোদ্গারে। গালিগালাজ কিংবা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে বাদ দিতে হয়েছে স্পিকারকে। এ ধরনের আচরণ তরুণ প্রজন্মের কাছে রাজনীতি সম্পর্কে একটি নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছিল।
প্রধান ও বিরোধী দলের নেতাদের এ সৌহার্দপূর্ণ আলোচনা প্রমাণ করে, রাজনীতিতে মতভিন্নতা থাকবেই, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত বিদ্বেষে রূপ না নেয়। গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্যই হলো ‘সহনশীলতা’। সোমবারের এ ঘটনা জাতীয় রাজনীতিতে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে, যা সংসদকে সত্যিকারের আইন প্রণয়ন ও জবাবদিহির কেন্দ্রে পরিণত করবে।
বাজেট অধিবেশন ও জাতীয় ঐকমত্যের বার্তা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এ বাজেট অধিবেশনটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাজেট নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে নানা বিতর্ক, সমালোচনা ও সংশোধনী প্রস্তাব আসাই স্বাভাবিক এবং এটাই গণতন্ত্রের নিয়ম। বিরোধী দল বাজেটের খামতিগুলো তুলে ধরবে এবং সরকারি দল তা যুক্তির আলোকেই রক্ষণ বা সংশোধন করবে। কিন্তু অধিবেশন শেষের এ মেলবন্ধন বার্তা দেয় যে-বিতর্ক ও মতপার্থক্য কেবলই নীতির প্রশ্নে, দেশের সামগ্রিক স্বার্থে বা জনগণের কল্যাণে দুপক্ষই এক সুতোয় বাঁধা। নেতাদের এ আচরণ সংসদ-সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মধ্যেও এ বিশ্বাস তৈরি করবে, দেশের বৃহত্তর সংকটে বা জাতীয় স্বার্থে এ দুই দল একসঙ্গে বসে আলোচনা করতে সক্ষম। এটি বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক মহলেও দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরবে।
ইতিহাসের শিক্ষা ও বর্তমানের দায়বদ্ধতা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগের অভাব এবং অতিরিক্ত দূরত্ব অনেক সময় দেশকে চরম সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সংঘাত, সহিংসতা আর অচলাবস্থার রাজনীতি দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এ নতুন নেতৃত্ব যদি অতীতের সেই ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি নতুন ধারা তৈরি করতে পারেন, তবে তা হবে দেশের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের এ পারস্পরিক খোঁজখবর নেওয়া ও দীর্ঘ আলাপচারিতা কেবল একটি সাময়িক ঘটনা হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এটিকে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে হবে।
এ ধারা অব্যাহত রাখার চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
সোমবারের ঘটনাটি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার সূচনা, তবে এ সৌহার্দের ধারাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ ধারা অব্যাহত রাখতে উভয় পক্ষকেই কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে :
সংসদে গঠনমূলক সমালোচনা : বিরোধী দলকে কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে সরকারের ভুলত্রুটিগুলো তথ্যপ্রমাণসহ গঠনমূলকভাবে তুলে ধরতে হবে।
সরকারের পরমতসহিষ্ণুতা : বিরোধী দলের যৌক্তিক সমালোচনাকে সরকার পক্ষকে ধৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে এবং সংসদে তাদের পর্যাপ্ত সময় ও গুরুত্ব দিতে হবে।
টেলিভিশন ও টকশোতে আচরণের প্রতিফলন : সংসদের ভেতরের এ সৌজন্য যেন সংসদের বাইরে, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ এবং গণমাধ্যমের টকশোতেও প্রতিফলিত হয়। বাইরে গিয়ে আবারও বিষোদ্গার শুরু করলে সংসদের এ দৃশ্য তার মহিমা হারাবে।
স্থায়ী কমিটির কার্যকারিতা : সংসদের বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ-সদস্যরা যাতে একসঙ্গে বসে দেশের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সোমবার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের ভেতরে যে হাসিমুখের দৃশ্যটি দেশবাসী দেখেছে, তা ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক তপ্ত মরুর বুকে এক পশলা বৃষ্টির মতো। ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবেই, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়-ত্রয়োদশ সংসদের দুই প্রধান নেতা দেশবাসীকে সেই আশার আলোই দেখিয়েছেন।
জনগণ আর সংসদে হই-হট্টগোল, গালিগালাজ কিংবা কাদা ছোড়াছুড়ি দেখতে চায় না। তারা দেখতে চায় যুক্তি ও তথ্যের লড়াই, যেখানে দিনশেষে জয় হবে দেশের মানুষের। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার হাত মেলানোর এ দৃশ্যটি কেবল একটি ফ্রেমবন্দি ছবি হয়ে না থেকে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার এক চিরস্থায়ী ধারা হিসাবে অব্যাহত থাকুক-এটাই আজ দেশবাসীর প্রত্যাশা।
মাহমুদুল হাসান : ইতিহাসবিদ, গবেষক








