দেশকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল করে বিশ্বদরবারে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসাবে চিত্রায়িত করার একটি বিপজ্জনক নীলনকশা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি প্রভাবশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ মদদে কক্সবাজারের মিয়ানমার সীমান্ত এবং বান্দরবানের দুর্গম পার্বত্য এলাকাকে কেন্দ্র করে এই চক্রান্তের সুনিপুণ ‘চিত্রনাট্য’ (স্ক্রিপ্ট) সাজানো হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এই এলাকা দুটি কৌশলগতভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত স্বাধীনতাকামী একটি সশস্ত্র সংগঠনের শাখা বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে-বিশ্বের কাছে এই সাজানো অপতথ্য (ডিজইনফরমেশন) প্রতিষ্ঠা করাই এই চক্রের মূল লক্ষ্য। চরম রাষ্ট্রবিরোধী এই পরিকল্পনায় দেশীয় সহযোগী হিসাবে পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও সাবেক জনপ্রতিনিধি। জড়িতদের চিহ্নিত করতে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ও শীর্ষ নেতাদের বৈঠক : অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান বিএনপি সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে দুর্বল ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা। মূলত এই উদ্দেশ্য হাসিল করতেই চক্রান্তের জাল বোনা হয়েছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এই চক্রান্তের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা মাহবুবউল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা সম্পূর্ণভাবে অবগত আছেন।
সম্প্রতি অনলাইনে অনুষ্ঠিত এক গোপন বৈঠকে গাজীপুরের সাবেক বিতর্কিত মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এই ‘নাটক’ সফল করতে প্রয়োজনীয় সব অর্থ একাই জোগান দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ওই অনলাইন বৈঠকে যুক্ত থাকা একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা যুক্ত হন। সেখানে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আরও জানান, পুরো বিষয়টি ইতোমধ্যেই তাদের ‘নেত্রী’কেও (আওয়ামী লীগ সভানেত্রী) অবগত করা হয়েছে। তবে তথ্য ফাঁসের আশঙ্কায় সাধারণ স্তরের নেতাকর্মীদের এ থেকে দূরে রাখতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা থেকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং ডিজিএফআইয়ের সব কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। এর ঠিক আগে, মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কক্সবাজার ও বান্দরবানে দায়িত্বরত এলিট ফোর্স র্যাব-১৫-এর অধিনায়কসহ একযোগে ৬০০ জনেরও বেশি র্যাব সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। একটি সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চলে গোয়েন্দা সংস্থা ও র্যাবের এতবড় রদবদলের ফলে সৃষ্ট সাময়িক শূন্যতাকেই ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হিসাবে বেছে নিয়েছে ষড়যন্ত্রকারী চক্রটি।
মাঠপর্যায়ে শফিউল্লাহর মিশন : একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, পাহাড়ি অঞ্চলে এই ‘নাটক’র মূল স্ক্রিপ্ট বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ শফিউল্লাহকে। তার ওপর দায়িত্ব রয়েছে-রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে দুর্গম অঞ্চলে ছদ্মবেশী ‘প্রশিক্ষণ’র ভিডিও ধারণ করা। ইতোমধ্যেই কিছু নির্দিষ্ট ভাড়াটিয়া লোকজনকে সীমান্তবর্তী এলাকায় পাঠানো হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে সোমবার দুপুর ২টা ৫৭ মিনিটে আওয়ামী লীগ নেতা শফিউল্লাহর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করতেই ব্যাকগ্রাউন্ডে রোহিঙ্গা ভাষায় কাউকে বক্তব্য রাখতে শোনা যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শফিউল্লাহও স্বীকার করেন, তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন। তবে চক্রান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ প্রসঙ্গে আমি কিছুই জানি না। আর গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে আমার কোনোদিন দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি।’
জড়িতদের চিহ্নিত করতে মাঠে গোয়েন্দারা : গোয়েন্দা সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, দেশের অভ্যন্তরে এমন নাটক সাজানোর বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। জড়িতদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারকে দুর্বল করার জন্য একটি চক্র চক্রান্ত করছে। এতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও জড়িত। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘কলেমার পতাকা’ উত্তোলনের যে হিড়িক দেখা গেছে, তা মূলত এই বড় ষড়যন্ত্রেরই একটি সুদূরপ্রসারী অংশ। সরল ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে চক্রটি আন্তর্জাতিক মহলে ভিন্ন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
লক্ষ্য বর্তমান সরকারকে কোণঠাসা করা : নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘পৃথিবীর কোথাও আলোচিত সেই স্বাধীনতাকামী সংগঠনের আন্তর্জাতিক শাখা বা উইং নেই। সম্প্রতি একজন ইসরাইলি কূটনীতিকের দেওয়া একটি বক্তব্যকে পুঁজি করে যদি এ দেশে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বানোয়াট নাটক সাজানোর চেষ্টা করে কিংবা গুজব রটায়, তবে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘মূলত বিদেশি বন্ধুদের কাছে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করা এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করাই এ ধরনের অপপ্রচারের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে গিয়ে এ ধরনের বিপজ্জনক খেলা খেললে প্রকারান্তরে রাষ্ট্র ও দেশের সাধারণ জনগণেরই বড় ক্ষতি হবে। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। তাই আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উচিত অত্যন্ত কঠোরতার সঙ্গে এ ধরনের যে কোনো অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্র শুরুতেই নস্যাৎ করে দেওয়া।’ এ বিষয়ে কক্সবাজার বিজিবি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা। এই সীমান্ত ব্যবহার করে কোনো গোষ্ঠী যেন দেশের স্থিতিশীলতা কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সে বিষয়ে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত অঞ্চলকে ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদ বা অন্য কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের মিথ্যা নাটক সাজানোর অপচেষ্টা করা হলে তা অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করা হবে। এই ধরনের অপতৎপরতা রুখতে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে।’








