একসময় সাপে কাটলে গ্রামের মানুষ ছুটতেন ওঝা-কবিরাজের কাছে। ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ আর কুসংস্কারের কারণে চিকিৎসা পেতে দেরি হতো, অনেক ক্ষেত্রেই প্রাণহানি ঘটত। কিন্তু সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে। এখানে এখন সাপে কাটা রোগীদের প্রথম ভরসার নাম বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

মাত্র ৩২ দিনে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন ৩১ জন সর্পদংশনের রোগী। তাদের মধ্যে চারজন ছিলেন অত্যন্ত বিষধর গখরা (কোবরা) সাপের কামড়ে আক্রান্ত। সময়মতো অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ, চিকিৎসকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং সমন্বিত চিকিৎসাসেবায় সবাইকে সুস্থ করে তুলেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চিকিৎসকদের ধারাবাহিক এই সাফল্যে বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন শুধু উপজেলার নয়, আশপাশের এলাকার মানুষের কাছেও সর্পদংশনের নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

সাপে কাটা চিকিৎসায় দৃষ্টান্ত গড়লো বোচাগঞ্জ হাসপাতাল

গখরার কামড়েও ফিরছে জীবন

সর্বশেষ বুধবার (৫ আগস্ট) বিকেলে বোচাগঞ্জ উপজেলার ইজিবাইকচালক তরিকুল ইসলামের স্ত্রী সাদিয়া আক্তার (১৭) বাড়ির আঙিনায় কুকুর-বিড়ালের মারামারি থামাতে গিয়ে সাপের কামড়ে আহত হন।

‘সাপের কামড়ের ঘটনায় ঝাড়ফুঁক, কুসংস্কার বা চিকিৎসায় বিলম্ব না করে দ্রুত হাসপাতালে আসাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের মাধ্যমে অধিকাংশ সর্পদংশনের রোগীকেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব’

পরিবারের সদস্যরা কোনো ঝাড়ফুঁক বা স্থানীয় চিকিৎসার চেষ্টা না করে দ্রুত তাকে বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আবদুল্লাহ ইবনে এনামসহ চিকিৎসকরা দংশনের চিহ্ন শনাক্ত করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন। পরে বিষক্রিয়ার নিউরোলজিক্যাল লক্ষণ দেখা দিলে জাতীয় চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী দ্রুত অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা হয়। সময়োপযোগী চিকিৎসায় সাদিয়া সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন

সাপে কাটলে প্রথমেই যা করবেন

এর আগে, ২৫ জুলাই দফচাই গ্রামের সাদেকুল ইসলাম (২১), ১০ জুলাই জাওগাঁও গ্রামের সুজন চন্দ্র রায় (২৭) এবং ৪ জুলাই কাহারোল উপজেলার তারগাঁও গ্রামের প্রকৃত চন্দ্র রায় (৪৩) গখরার কামড়ে আক্রান্ত হয়ে একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন।

সাপে কাটা চিকিৎসায় দৃষ্টান্ত গড়লো বোচাগঞ্জ হাসপাতাল

সীমিত সম্পদেও ধারাবাহিক সাফল্য

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ হাসাপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সর্পদংশন রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সর্পদংশনের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। এ হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টাই জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আবদুল্লাহ ইবনে এনাম বলেন, সীমাবদ্ধ সম্পদের মধ্যেও সঠিক সিদ্ধান্ত, দ্রুত চিকিৎসা এবং শক্তিশালী টিমওয়ার্কের কারণে একের পর এক রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, পরপর তিনটি সফল চিকিৎসার পর বুধবার আরও একটি প্রাণ বাঁচাতে পেরেছি। সাপ না চিনলেও বা না দেখতে পেলেও সময় নষ্ট না করে সরাসরি হাসপাতালে চলে আসাই রোগীর প্রাণ বাঁচানোর সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।

আরও পড়ুন

সাপের কামড়ে মৃত্যু ঠেকাতে রোগী ও স্বজনদের করণীয়

তিনি জানান, ৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ২৯ জন সর্পদংশনের রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চারজন ছিলেন গোখরা সাপের কামড়ে আক্রান্ত। চারজনই বর্তমানে সুস্থ।

তার ভাষায়, প্রতিটি রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার সময় স্বজনদের মুখের স্বস্তির হাসিই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

‌‘৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ২৯ জন সর্পদংশনের রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চারজন ছিলেন গখরা সাপের কামড়ে আক্রান্ত। চারজনই বর্তমানে সুস্থ’

বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.বিজয় কুমার রায় বলেন, সাপের কামড়ের ঘটনায় ঝাড়ফুঁক, কুসংস্কার বা চিকিৎসায় বিলম্ব না করে দ্রুত হাসপাতালে আসাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের মাধ্যমে অধিকাংশ সর্পদংশনের রোগীকেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

এদিকে সরকারি বরাদ্দের বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করে সহযোগিতা করছেন বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মারুফ হাসান।

সাপে কাটা চিকিৎসায় দৃষ্টান্ত গড়লো বোচাগঞ্জ হাসপাতাল

তিনি বলেন, উপজেলায় সর্পদংশনের রোগী বেড়েছে। অনেক রোগী হাসপাতালে এলেও অর্থের অভাবে অ্যান্টিভেনম কিনতে পারেন না। আবার অনেক সময় উপজেলা পর্যায়ে ওষুধ পাওয়া যায় না। ফলে চিকিৎসা শুরু করতেই দেরি হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

ওঝা থেকে মুখ ফেরালেই কমবে সাপে কাটা মৃত্যু

তিনি জানান, এ পরিস্থিতি বিবেচনায় উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করা হচ্ছে। হাসপাতালের মজুত কমে এলেই নতুন করে ওষুধ দেওয়া হবে।

ইউএনও বলেন, এতে রোগীরা যেমন উপকৃত হচ্ছেন, তেমনি চিকিৎসক ও নার্সরাও দ্রুত চিকিৎসা দিতে পারছেন। ফলে অনেক মূল্যবান প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে।

এএমএইচএম/কেএইচকে/জেআইএম