২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ক্যাপিটালাইজেশনের জন্য বরাদ্দ রেখেছে। এটা ঠিক আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশনই বলি আর যাই বলি, তাদের এ পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ব্যাংক ধসে পড়েছে। বলতে গেলে এসব ব্যাংক এখন খাদের কিনারে চলে গেছে। এসব ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সক্ষম হচ্ছে না। ফলে এ ব্যাংকগুলোকে টেনে তোলার জন্য সরকারকে ৪০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হচ্ছে। যদিও এগুলো মূলত জনগণেরই টাকা। আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ পদক্ষেপ ‘ওয়ান্স ফর অল’ হবে। মানে বর্তমান এ পরিস্থিতি একবার শেষ হলে সামনে আর কোনোদিন এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। সামনে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি আর তৈরি না হয়, সে ব্যাপারে আমাদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটতে দেখলে সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

বাজেটে দেখলাম, স্টার্ট আপ আবার নন ইনফরমাল সেক্টরে সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর জন্য কিছু টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারের এ পদক্ষেপকেও সাধুবাদ জানাই। কারণ এতে স্টার্ট আপ ও নন ইনফরমাল সেক্টরগুলো প্রাণ ফিরে পাবে, অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে। ভালো কিছু হোক, এটা আমাদের সবারই প্রত্যাশা। মানুষ তার প্রত্যাশিত ভালো ফল দেখতে চায়। পুঁজিবাজার সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আশাব্যঞ্জক অনেক কথা বলেছেন। তার সেসব বক্তব্যকেও সাধুবাদ জানাতে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এনবিআর তার কথার উলটো পথে হাঁটছে। অর্থমন্ত্রী বা সরকার চাচ্ছে পুঁজিবাজারকে বড় করতে, অংশগ্রহণমূলক করতে এবং ভালো ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে। কিন্তু পত্রিকার রিপোর্ট পড়ে হতাশ হলাম। শেয়ারবাজারে একসময় ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড আয়কর মওকুফ ছিল। সেটাকে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। আমরা জানি, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে একটা ট্যাক্স রিবেট পাওয়া যায়। এ রিবেটের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা। কিন্তু পত্রিকায় দেখলাম, সেটাকে এখন নাকি ৭ লাখে নামিয়ে আনা হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে পুঁজিবাজারকে বড় করা, অংশগ্রহণমূলক করা এবং উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের বিনিয়োগের জন্য একটা সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু সেক্ষেত্রে এনবিআর যেটা করছে, সেটা এর ঠিক উলটো। এতে জনগণ নিরুৎসাহিত হবে। সুতরাং সরকারের উচিত শেয়ারবাজার ও এনবিআরের মধ্যে একটা সমন্বয় করা। কেননা পুঁজিবাজারে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ চাচ্ছি। অপরদিকে তাদের দেওয়া সুবিধা যতটুকু ছিল, সেটাও উঠিয়ে দিচ্ছি। তাহলে তো কোনো লাভ হলো না।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে, ঈদের ২-৩ দিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করেছে, ২ হাজার কোটি টাকা না হলে তাদের ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিতে দেবে না। সর্বোচ্চ ক্যাশ ডিভিডেন্ড সম্ভবত ৩০ শতাংশের মধ্যে বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংকব্যবস্থায় কী সুবিধা আসবে বা আদৌ আসবে কি না, আমার জানা নেই। ভালো ব্যাংক যেগুলো রয়েছে, যাদের এনপিএল কম এবং আমানতকারীদের তুলনায় যথেষ্ট পুঁজি আছে, তাদের ওপর কেন এ সীমাবদ্ধতা? ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ দেওয়ার জন্য তাদের কেন স্বাধীনতা দেওয়া হবে না? তাদের বাধ্য করা হচ্ছে ক্যাশ আউট করে ডিভিডেন্ড না ওঠানোর জন্য। এতে ব্যাংকাররা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এখন প্রশ্ন হলো, পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগকারী হিসাবে যারা আছেন, এসবের কারণে তারা কি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? আসলে ভালো ব্যাংকগুলোর জন্য এটা একটা দুঃখজনক ব্যাপার। যেসব ব্যাংক বসে গেছে, আমরা তো সেগুলো নিয়ে কথা বলছি না। আমরা বলছি, যে ১০-১২টি ব্যাংক ভালো করছে, তাদের ওপর ক্যাশ ডিভিডেন্ড পে আউট করার ক্ষেত্রে কেন এই সীমাবদ্ধতা?

আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব পদক্ষেপ পুঁজিবাজার নিয়ে অর্থমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, এর স্পিরিটের বিরুদ্ধে যাবে। এটা নিয়ে ইতোমধ্যেই ব্যাংকারস অ্যাসোসিয়েশন বড় আকারে প্রতিবাদ শুরু করে দিয়েছে। আমি নিজে ইকোনমি সায়েন্সের লোক হয়ে বলব, পৃথিবীতে এমন বহু ব্যাংক আছে, যাদের পেইডআপ ক্যাপিটাল ২ হাজার কোটি টাকার নিচে। কিন্তু তারা ভালো করছে। যাদের এনপিএল কম, তাদের বিরুদ্ধে তো এ ধরনের কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি। কোনো ব্যাংকের সিআর বা ক্যাপিটাল রেশিও যদি পক্ষে থাকে, তাহলে তাদের ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেবেন না কেন? যদি না দেন, তাহলে শেয়ারবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকার একদিকে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন চাচ্ছে, পরিধি বাড়াতে চাচ্ছে, অংশগ্রহণমূলক করতে চাচ্ছে, অপরদিকে এসব সীমাবদ্ধতা আরোপ করছে। এ ধরনের পদক্ষেপগুলো নিজের পায়ে নিজেই কুঠারাঘাতের শামিল। আমরা এটা চাই না। সরকারকে বুঝেশুনেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শুধু ট্যাক্সের আকার বাড়িয়ে সরকার বেশিদূর এগোতে পারবে না। কারণ, অতিরিক্ত ট্যাক্স আরোপ অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। ট্যাক্সের ক্ষেত্রে রেশনালাইজড করা উচিত। তা না হলে দেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলবে। শোনা যাচ্ছে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি নাকি যে কোনো সময় বাংলাদেশ থেকে চলে যেতে পারে। তারা যদি চলে যায়, তাহলে বাংলাদেশ একটা ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ, দেশের টোটাল ট্যাক্স কালেকশনের ৯/১০ শতাংশ তারাই দিচ্ছে। বছরে তাদের কাছ থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকা দেশের কোষাগারে জমা হচ্ছে। এখন সরকার যদি তাদের ওপর আরও কর বসাতে চায়, তাহলে তারা এখানে থাকবে কেন? ১৩০টি দেশে তাদের ব্যবসা রয়েছে, বাংলাদেশে যদি তারা ব্যবসা না করে, কী আসে যায়। গ্ল্যাক্সো, ফাইজারের মতো অনেক ভালো ভালো বহুজাতিক কোম্পানি এদেশ থেকে চলে গেছে। এগুলো কী ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেটা আমাদের অনুধাবন করতে হবে। আমাদের ভাবতে হবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে কীভাবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করে রাখা যায়।

আমাদের দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেশি। সুদের হার কমানোর বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় রেপো রেট বা পলিসি রেট হচ্ছে সাড়ে ৫ শতাংশ। আর আমাদের রেপো রেট ১০ শতাংশ। তাহলে অর্থনীতির চাকায় গতি আসবে কীভাবে? ২০০ কোটি টাকা বন্ধ কলকারখানার মালিকদের না দিয়ে যদি সুদের হার কমিয়ে দেওয়া হয়, তখন কলকারখানার মালিকরা কম সুদে ঋণ নিয়ে তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারবে। অন্যরাও সে সুযোগ নিতে পারবে। এতে অসুবিধা কোথায়? যারা প্রকৃত অর্থে ভালো ব্যবসা করছে অথবা কন্ট্রিবিউট করছে, তাদের স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করলেই তো হয়। তাদেরকে প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজন হবে বলে তো মনে হয় না।

সরকারকে ঘাটতি বাজেট এবং প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য অর্থের উৎস হিসাবে বিকল্প চিন্তা করতে হবে। শুধু ট্যাক্স কালেকশনের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। তালিকা করে সরকারের কিছু অলস এন্টারপ্রাইজ বিক্রি করে দেওয়া উচিত। যেসব প্রকল্পে ক্যাশ ফ্লো আছে, সেগুলোকে সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমে বন্ড ও সুকুক ইস্যু করে টাকা নেওয়া উচিত। তাহলে সরকারের হাতে একটা ভালো অঙ্কের অর্থ চলে আসবে। এগুলো নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা উচিত। শুধু বাইরে থেকে ঋণ করে অথবা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ করে প্রকল্পে অর্থায়ন করলে সুদের মাত্রা বাড়তে থাকবে। সুদের বোঝা বাড়তে থাকলে সেটা একসময় বাংলাদেশ দিতে পারবে না। তখন শেষ পর্যন্ত সবাই আমরা মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পড়ব। সুতরাং সরকারকে নতুন করে ঋণ না করে বিকল্প পথ থেকে টাকা সংগ্রহ করতে হবে। বর্তমানে সরকারের পরিচালনা ব্যয়ের এক নম্বর খাত হচ্ছে সুদ পেমেন্ট। সেটা যদি আবার বিশাল হতে থাকে, শেষ পর্যন্ত ঋণকে মানিটাইজ করতে মানি প্রিন্টিং করতে হবে। তখন হতে থাকবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। চোর-বাটপাড় ছাড়া অন্যরা সবাই গরিব হতে থাকবে। আমরা এমনটি কখনোই চাই না। (অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার)

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি