দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় সরকারি ও বেসরকারি চাকরির মধ্যে বৈষম্য নতুন কোনো বিষয় নয়। আমাদের সমাজব্যবস্থায় সরকারি চাকরি যেন শুধু একটি পেশা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাড়তি সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা, প্রভাব এবং একধরনের আলাদা শ্রেণিগত অবস্থান। বিপরীতে একজন বেসরকারি চাকরিজীবী, তিনি যত বড় প্রতিষ্ঠানেই চাকরি করুন, যত উচ্চশিক্ষিতই হোন কিংবা যত আকর্ষণীয় বেতনই পান না কেন, সামাজিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনেক সময় তাঁকে সরকারি চাকরিজীবীর সমপর্যায়ে বিবেচনা করা হয় না।
কেন এ বৈষম্য
সরকারি চাকরিতে একজন কর্মচারীর পদ, গ্রেড, বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক অবস্থান একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সংজ্ঞায়িত। একজন কর্মকর্তা কোন গ্রেডে আছেন, তাঁর পদমর্যাদা কী, তিনি কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা—এসব বিষয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। ফলে সমাজেও তাঁর একটি নির্দিষ্ট মর্যাদা তৈরি হয়।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে একই ধরনের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সামাজিক অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করে তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, কত বেতন পাচ্ছেন কিংবা সমাজের চোখে তাঁর প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু—এর ওপর। ফলে একটি বহুজাতিক কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিংবা একটি বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজারও অনেক ক্ষেত্রে সরকারি একজন মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তার মতো সামাজিক মর্যাদা পান না।
এটি নিছক সামাজিক মানসিকতার বিষয় নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও নীতিগত বাস্তবতা।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
রাষ্ট্র কি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের দিয়েই পরিচালিত হয়
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নির্ধারিত বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপযুক্ত বেতন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান রাখা অন্য কোটি কোটি মানুষের কথা কি একইভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে?
একটি দেশের অর্থনীতি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর নির্ভর করে না; বরং বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পেশাজীবীসহ সমাজের প্রায় প্রতিটি শ্রেণির মানুষের শ্রম, আয় ও করের ওপর রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন পরিচালন ব্যয়ের অর্থের বড় একটি অংশ আসে জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত কর ও অন্যান্য রাজস্ব থেকে। সেই জনগণের একটি বড় অংশই বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।
তাহলে রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে তাঁদের প্রতি এতটা বৈষম্য কেন?
একই দেশে দুই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা
শুধু চাকরির ক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষাব্যবস্থাতেও আমাদের দেশে এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা চোখে পড়ে। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামো, শিক্ষকতার মান, ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার পরিবেশে এখনো বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, যাঁরা রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করেন, তাঁদের একটি বড় অংশ নিজেদের সন্তানদের জন্য বেসরকারি স্কুল, কলেজ কিংবা ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বেশি পছন্দ করেন। অবশ্য প্রত্যেকের নিজের সন্তানের জন্য পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—যদি সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা সত্যিই যথেষ্ট মানসম্পন্ন ও আকর্ষণীয় হয়, তাহলে সে ব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত অনেক পরিবার কেন নিজেদের সন্তানদের জন্য বিকল্প খুঁজে নেয়?
একই প্রশ্ন স্বাস্থ্য খাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সামর্থ্যবান মানুষদের একটি বড় অংশ চিকিৎসার প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের দিকে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও যাচ্ছেন। সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেও এমন প্রবণতা দেখা যায়।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে উন্নীত করা হচ্ছে না কেন, যাতে সরকারি-বেসরকারিনির্বিশেষে সবাই আস্থার সঙ্গে সেই সেবা গ্রহণ করতে পারেন?
বেসরকারি চাকরিজীবীরা কি রাষ্ট্রের বাইরের কেউ
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই।
একজন বেসরকারি চাকরিজীবীও এই দেশের নাগরিক। তিনি ভোট দেন, কর দেন, পরিবার পরিচালনা করেন, সন্তানদের শিক্ষিত করেন, অর্থনীতিতে অবদান রাখেন এবং দেশের উৎপাদন ও সেবা খাত সচল রাখেন। একজন ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন এবং কর প্রদান করেন। একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষও তাঁর শ্রমের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন।
তাহলে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা কিংবা নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম কেন?
সরকার পরিবর্তন হয় জনগণের ভোটে। আর সেই জনগণের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী যেমন আছেন, তেমনি বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ নাগরিকও রয়েছেন।
কিন্তু বাস্তবে মনে হয়, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা, গ্রেড, পেনশন, চাকরির নিরাপত্তা, বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, বেসরকারি খাতে কর্মরত কোটি মানুষের কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা, অবসর-পরবর্তী সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে ততটা আলোচনা হয় না।
বেসরকারি চাকরিজীবীর জীবনে অনিশ্চয়তা বেশি
সরকারি চাকরির অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো চাকরির নিরাপত্তা। নির্দিষ্ট নিয়ম ও কাঠামোর মধ্যে একজন সরকারি কর্মচারী দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করতে পারেন। অবসর-পরবর্তী নানা সুবিধাও থাকে।
বেসরকারি খাতে বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে, চাকরি চলে যেতে পারে, ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কারণে কর্মী ছাঁটাই হতে পারে কিংবা বয়স ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কারণে একজন দক্ষ কর্মীকেও চাকরি হারাতে হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন চাকরি করার পরও একজন বেসরকারি কর্মীর অবসর-পরবর্তী জীবন নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা থাকে না।
একজন মানুষ জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল সময়টি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয় করেন। কিন্তু চাকরি শেষে তাঁর ভবিষ্যৎ কী—এ প্রশ্নের উত্তর অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চিত।
এ জায়গাতেই রাষ্ট্রের আরও বেশি মনোযোগ প্রয়োজন।
বৈষম্য নয়, প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো
সরকারি চাকরিজীবীদের সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে বেসরকারি চাকরিজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা কোনো সমাধান নয়; বরং প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতের কর্মজীবী মানুষের অবদানকে রাষ্ট্র সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গ্রেড থাকবে, বেতনকাঠামো থাকবে, চাকরির নিরাপত্তা থাকবে—এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্যও ন্যায্য মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, অবসরকালীন সুরক্ষা এবং শ্রমিক-কর্মচারীর অধিকার নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
একজন বেসরকারি কর্মকর্তা যদি একই দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, নিয়মিত কর প্রদান করেন এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখেন, তাহলে তাঁর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মূল্যায়নও যথাযথ হওয়া উচিত।
শেষ কথা
একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত হয়, যখন রাষ্ট্রের নীতি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা পেশাজীবী গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে তৈরি না হয়ে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণকে সামনে রেখে প্রণীত হয়।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ—এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তারাই রাষ্ট্র নন। একইভাবে বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ মানুষও রাষ্ট্রের বাইরে নন।
রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রের অংশীদার। তাই প্রশ্নটা সরকারি চাকরিজীবীদের সুবিধা কমানো বা বেসরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে তাঁদের প্রতিযোগিতা তৈরি করার নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি তার সব নাগরিকের জন্য সমান মর্যাদা, সুযোগ এবং নিরাপত্তার একটি ন্যায়সংগত কাঠামো তৈরি করতে পারছে?
যে বেসরকারি চাকরিজীবীর করের টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়, যে ব্যবসায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন, যে শ্রমিক নিজের ঘাম ঝরিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সুবিধার অংশীদারত্বে তাঁদেরও সমান অধিকার থাকা উচিত।
কারণ, দেশ শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের নয়; দেশ সবার। আর রাষ্ট্রের সুবিধাও হওয়া উচিত সবার জন্য—যোগ্যতা, অবদান ও নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে; পেশার পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি ও লেখক





