সম্পত্তির লোভ ও সরকারি চাকরি পাওয়ার লালসায় নিজের জন্মদাত্রী মাকে হত্যার এক নৃশংস নীল নকশা করেছিলেন ২৩ বছরের তরুণী। তবে সাধারণ কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, ঘটনাটিকে পথদুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিতে মোটা টাকা দিয়ে ‘কিলার’ বা চুক্তিভিত্তিক খুনিও ভাড়া করেছিলেন তিনি। সম্প্রতি ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে ঘটেছে এই গা শিউরে ওঠা ঘটনা।

পুলিশ জানিয়েছে, গত ৩ জুলাই জয়পুরের প্রতাপ নগর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত নারীর নাম নীরজ শর্মা (৪৫)। তিনি আদালতে লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক (এলডিসি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে মেয়ে আয়ুশি শর্মাসহ মোট সাতজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে আরও এক অভিযুক্ত পলাতক রয়েছে।

আরও পড়ুন

ভালোবাসার বিয়েতে লুকিয়ে ছিল ভয়াবহ প্রতারণা, শেষে মর্মান্তিক পরিণতি

যেভাবে ঘটে নৃশংস হত্যাকাণ্ড

তদন্তকারীদের বরাতে পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন ছেলেকে কোচিং সেন্টারে নামিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন নীরজ শর্মা। এ সময় প্রায় ১৩০ কিলোমিটার গতিতে আসা একটি এসইউভি গাড়ি তাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতায় নীরজের শরীর প্রায় ১০০ ফুট উঁচুতে ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই চালক গাড়ি নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।

শুরুতে একে সাধারণ দুর্ঘটনা মনে করা হলেও পুলিশ এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে নতুন তথ্য পায়।

ফুটেজ দেখে তদন্তকারীদের সন্দেহ হয় যে, এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পরে তদন্তের পরিধি বাড়াতেই বেরিয়ে আসে নিজ পরিবারের সদস্যদের জড়িত থাকার এই ভয়াবহ তথ্য।

চাকরি ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ

জয়পুর পুলিশের ডিসিপি (ইস্ট) রঞ্জিতা শর্মা জানান, প্রায় এক বছর আগে নীরজ শর্মার স্বামী মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর তার পরিবর্তে সহানুভূতির ভিত্তিতে আদালতে চাকরি পান নীরজ।

কিন্তু আয়ুশি চেয়েছিলেন বাবার মৃত্যুর পর সরকারি চাকরিটি যেন তিনি পান। মা চাকরি নিজে নেওয়ায় মেয়ের মনে ক্ষোভের তৈরি হয়। এর পাশাপাশি গত দুই-তিন বছর মা ও মেয়ের মধ্যে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়েও তীব্র বিরোধ চলছিল।

আরও পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গ / বন্দুকযুদ্ধে নিহত ধর্ষণ-হত্যার অভিযুক্ত, মরদেহ নিতে চায় না পরিবার

সাত লাখ রুপিতে কিলার ভাড়া

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, মাকে চিরতরে সরিয়ে দিতে নিজের চাচা মোহন স্বরূপ ও চাচাতো ভাই বলরাম ওরফে রবির সঙ্গে হাত মেলান আয়ুশি। তারা তিনজন মিলে ভরতপুরের বাসিন্দা হেমন্ত শর্মা নামে এক ব্যক্তিকে খুনের চুক্তি দেন। এই কাজের জন্য সাত লাখ রুপি দেওয়া হয়।

পুলিশ জানায়, প্রায় এক মাস ধরে নীরজের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছিল। শুরুতে একটি থার এসইউভি ভাড়া করে নজরদারি চালানো হলেও প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর ঘটনার দিন একটি স্করপিও গাড়ি দিয়ে চূড়ান্ত হামলা চালানো হয়।

অভিযুক্তরা নীরজের গতিবিধি ট্র্যাক করার জন্য সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিল। মোহিত শর্মা নামের একজন নীরজের লোকেশন জানাচ্ছিল এবং রোহিত জাটভ নামের আরেকজন মোটরসাইকেল নিয়ে কাছাকাছি অবস্থান করছিল। আকাশ শর্মা নামের এক যুবক স্করপিও গাড়িটি চালাচ্ছিলেন এবং তার সঙ্গে ছিলেন অরবিন্দ শর্মা। নীরজকে ধাক্কা দেওয়ার পর তারা গাড়িটি ফেলে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যান।

আগেও পেয়েছিলেন প্রাণনাশের হুমকি

হত্যাকাণ্ডের পর নীরজের ভাই রাকেশ কুমার শর্মা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি পুলিশকে জানান, সম্পত্তি নিয়ে মেয়ে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন এবং চাচাতো ভাইয়ের মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন নীরজ। এমনকি এর আগে বেশ কয়েকবার তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আয়ুশি শর্মা, মোহন স্বরূপ, মোহিত শর্মা, আকাশ শর্মা, অরবিন্দ শর্মা, হেমন্ত শর্মা এবং রোহিত জাটভ। এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী বলরাম ওরফে রবিকে গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
কেএএ/