প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে একটি নীরব যন্ত্রণা বহমান ছিল, যা প্রকাশ্যে আলোচিত হয়নি, অথচ শত শত পরিবারের জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বহু কর্মকর্তাকে কোনো সুস্পষ্ট কারণ না দেখিয়ে অকালীন বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। কাউকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছিল, কাউকে বরখাস্ত, কাউকে আবার নীরবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল প্রশাসনিক আদেশের আড়ালে। এ কর্মকর্তাদের অনেকে ছিলেন মেধাবী, চৌকশ, দেশপ্রেমিক-যাদের অপরাধ ছিল কেবল এই যে, তারা তৎকালীন রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোর আনুকূল্যের বাইরে ছিলেন, অথবা কোনো একটি রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বৃত্তে তাদের অবস্থান রাষ্ট্রক্ষমতার চোখে সন্দেহজনক মনে হয়েছিল।

এই বঞ্চনার মাত্রা আন্দাজ করা যায় গত ১ জুলাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপন থেকে, যেখানে সেনাবাহিনীর ১১৫ জন, নৌবাহিনীর ২১ জন এবং বিমানবাহিনীর ১৪ জনসহ মোট ১৫০ জন কর্মকর্তার পুনর্বাসন, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও বকেয়া আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। লে. জে. (অব.) আবদুল হাফিজের নেতৃত্বে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি দীর্ঘ পর্যালোচনার পর এ সুপারিশ প্রস্তুত করে, যাতে বলা হয়-এ কর্মকর্তারা চাকরিজীবনে বৈষম্য, বঞ্চনা ও প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন। অনেকের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বা অকালীন অবসরের আদেশ বাতিল করে বয়সসীমা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত চাকরি বহাল ধরে স্বাভাবিক অবসর হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। কয়েকজনকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল, মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও কর্নেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তারা সংশোধিত অবসরের তারিখ পর্যন্ত উচ্চতর পদের বেতন-ভাতা বকেয়া হিসাবে পাবেন। কারও জন্য ৩০ লাখ, কারও জন্য ৫০ লাখ, আবার কারও জন্য ১ কোটি টাকা পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, সঙ্গে প্লট বা ফ্ল্যাট এবং সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পদায়নের সুযোগ। কিন্তু তা এতদিন কার্যকর করা হয়নি, নুতন সরকার ক্ষমতায় আসার পর অন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে তা পুনঃপর্যালোচনা সাপেক্ষে কার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

একজন কর্মকর্তার হঠাৎ চাকরিচ্যুতি কেবল তার নিজের জীবনের সংকট নয়, তা তার গোটা পরিবারের ওপর নেমে আসা এক দুর্যোগ। যে সন্তান বাবার ইউনিফর্ম দেখে গর্ব বোধ করত, সে হঠাৎ দেখে বাবা ঘরে বসে আছেন, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। যে স্ত্রী দীর্ঘ বদলির জীবনে স্বামীর পাশে থেকে সংসার সামলেছেন, তাকে হঠাৎ আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, কাউকে অপহরণের শিকার হতে হয়েছে, কেউ কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, যদিও এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রক্রিয়াধীন। আবার অনেকে দেশ ছেড়ে প্রবাসে আশ্রয় নিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের আশঙ্কায়। এ মানুষগুলোর কাছে অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধার চেয়েও বড় প্রশ্ন ছিল মর্যাদার-তাদের সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছিল, রাষ্ট্র কি তা স্বীকার করবে?

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য দপ্তরে বঞ্চিত কর্মকর্তারা মাসখানেকের মধ্যেই তাদের ন্যায্য পাওনা ফিরে পেতে শুরু করেন। কিন্তু সশস্ত্র বাহিনীর বঞ্চিত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘ, জটিল ও বিলম্বিত। প্রায় দুই বছর পার হওয়ার পর সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাল। এ দীর্ঘসূত্রতার পেছনে একাধিক কারণের কথা আলোচিত হয়েছে-অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সেনা সদর দপ্তরের মধ্যে মতপার্থক্য, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টিকে যথাযথ অগ্রাধিকার না দেওয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতা। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির প্রতি দোষারোপ না করে এটুকু বলা যায়-প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সমন্বয়হীনতা এ ন্যায্য দাবিকে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখেছিল, যা কাম্য ছিল না। পেশাদারত্ব মানে কেবল প্রশিক্ষণ বা শৃঙ্খলা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, যেখানে প্রতিটি কর্মকর্তা নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ন্যায্য ও পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ডে, কোনো ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সন্তুষ্টির ওপর নয়।

সশস্ত্রবাহিনীকে রাজনীতির বাইরে রাখার দায়িত্ব শুধু বাহিনীর নিজের নয়, বরং রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা প্রতিটি সরকারের। কোনো সরকার যখন বাহিনীকে নিজের রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, তখন তা সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থি। বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রে, যেখানে সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের তিক্ত অভিজ্ঞতা বহুবার ঘটেছে, সেখানে এই বিচ্ছিন্নতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পেশাদার সেনাবাহিনী মানে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে যে কোনো সরকারের অধীনে একইভাবে কার্যকর ও নিরপেক্ষ থাকা এবং একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক বেসামরিক কর্তৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই একটি স্বাস্থ্যকর সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের মূলকথা।

এ প্রেক্ষাপটে কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। পদোন্নতি বোর্ড, বাধ্যতামূলক অবসর ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার সিদ্ধান্তগুলো যদি স্বচ্ছ, লিখিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে নেওয়া হয় এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জানানোর একটি বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো সরকারের পক্ষে নীরবে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি প্রয়োজন একটি স্বাধীন আপিল বা পর্যালোচনা প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো কর্মকর্তা তার অবসর বা অপসারণের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোর বাইরে গিয়েও। সামরিক আদালত ও বেসামরিক বিচারব্যবস্থার মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জাতীয় সংসদের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিকে অধিকতর কার্যকর তদারকির ক্ষমতা দেওয়াও এ সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।

জনবল ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নও এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান-একদিকে বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সীমানা, অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ ও অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতামূলক প্রভাব বলয়-এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি নিছক প্রতিরক্ষা বাজেটের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয় নয়, বরং একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার। নৌবাহিনীকে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল রক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ও রণতরি প্রয়োজন। বিমানবাহিনীকে আকাশসীমা নিরাপত্তার জন্য আধুনিক রাডার নেটওয়ার্ক ও যুদ্ধবিমান বহর হালনাগাদ করতে হবে। সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী সক্ষমতা এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো অ-প্রথাগত হুমকি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ জরুরি হয়ে উঠেছে।

আধুনিকায়নের অর্থ শুধু অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়নও এর একটি অপরিহার্য অংশ। কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, গবেষণাভিত্তিক প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়নের জন্য একটি শক্তিশালী থিংক-ট্যাংক কাঠামো গড়ে তোলা এবং বেসামরিক-সামরিক সমন্বয়ের একটি স্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা-এসবই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হওয়া উচিত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণ যে আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জন করেছে, তাকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতার নতুন পথ খোলা সম্ভব। তবে এসব কিছুর ভিত্তি হতে হবে একটি স্থিতিশীল, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। কারণ আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি থাকলেও যদি কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে, ন্যায্যতার সংস্কৃতি না থাকে, তাহলে প্রকৃত সক্ষমতা অর্জিত হয় না।

এখন যে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা প্লট-ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা এসব কর্মকর্তার জীবনে হারানো বছরগুলো ফিরিয়ে দিতে পারবে না। যে সন্তান বাবার অনুপস্থিতিতে বেড়ে উঠেছে, যে কর্মকর্তা জীবনের সবচেয়ে সক্রিয় বছরগুলো অনিশ্চয়তায় কাটিয়েছেন, তাদের কাছে কোনো আর্থিক অঙ্কই সেই ক্ষতি পূরণ করতে পারে না। কিন্তু তারপরও এই স্বীকৃতির একটি গভীর মূল্য আছে। রাষ্ট্র যখন প্রকাশ্যে বলে-তোমাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছিল, তখন তা এক ধরনের মানসিক শান্তি বয়ে আনে। দীর্ঘদিনের অপমান, সন্দেহ আর নীরবতার পর এই স্বীকৃতিই এসব কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

আগামী দিনে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি প্রয়োজন গভীর মমতা, সম্মান ও যত্নের এক নতুন সম্পর্ক-যেখানে কোনো কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে কেবল তার পেশাগত দক্ষতা ও আনুগত্যের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক হিসাবনিকাশে নয়। পেশাদারত্ব, রাজনীতিমুক্ততা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আর প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন-এ চারটি উপাদানের সমন্বয়ই কেবল সশস্ত্র বাহিনীকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করতে পারে এবং একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে পারে যে কোনো সরকারের পরিবর্তনে আর কোনো কর্মকর্তার জীবন এভাবে বিপর্যস্ত হবে না। তবেই এ বঞ্চিত কর্মকর্তাদের দীর্ঘ কষ্টের একটি প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে।

মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা বিশ্লেষক