উন্নয়ন ও জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে দেশে একের পর এক প্রাকৃতিক বনভূমি ধ্বংসের যে আত্মঘাতী প্রবণতা চলছে, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার ঘটনাটি তার আরেকটি নিষ্ঠুর উদাহরণ। প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপজেলার বৈতরণি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বুক চিরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি সড়ক নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর এ ধরনের অবকাঠামো বা সড়ক নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। অথচ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বনের বুক চিরে এই কর্মযজ্ঞ চলছে।
শুরু থেকেই বন বিভাগ এই প্রকল্পের তীব্র আপত্তি জানিয়ে চিঠিপত্র দিলেও আইন ও প্রকৃতির তোয়াক্কা না করে প্রায় আট মাস ধরে বনের ভেতর পাহাড় ও ঢাল কেটে রাস্তা তৈরির কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে। ১ হাজার ৫৩১ একরের এই বৈতরণি সংরক্ষিত বনাঞ্চল খণ্ডিত করে সড়ক নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির যেমন মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি বর্ষায় পাহাড় বা ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। বন খণ্ডিত হলে বন্য প্রাণীর অবাধ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাদের আবাসস্থল সংকুচিত হয় এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ে। তার চেয়েও বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, বনের গভীর দিয়ে পাকা রাস্তা হলে সেখানে মানুষের আনাগোনা এবং অবৈধ জবরদখলকারীদের দৌরাত্ম্য বাড়বে; যা প্রকারান্তরে নির্বিচার গাছ কাটা এবং বনের মহামূল্যবান সম্পদ পাচারের মহোৎসবের পথ সুগম করে দেবে। মাত্র তিন–চারটি বসতবাড়ির সুবিধা কিংবা তথাকথিত যাতায়াতের দোহাই দিয়ে এমন একটি ঘন বনাঞ্চলকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই মানা যায় না।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক ভূমিকা দেখা যাচ্ছে স্থানীয় সংসদ সদস্যের। বন বিভাগের কঠোর আপত্তির পরও তিনি এই রাস্তা করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন এবং কাজ চালু রাখতে এলজিইডি কর্মকর্তাদের চাপ দিচ্ছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও জনপ্রতিনিধিদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো দেশের পরিবেশ, বনাঞ্চল ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ করা। যখন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেশের সবুজায়ন ও পরিবেশ রক্ষায় প্রতিনিয়ত জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন একজন সংসদ সদস্যের এই ভূমিকা কেবল দুঃখজনকই নয়, সাংবিধানিক দায়িত্বের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
উন্নয়ন কখনোই পরিবেশকে পুরোপুরি ধ্বংস করে হতে পারে না। কোনো জনপ্রতিনিধি বা সরকারি সংস্থা আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আমরা আশা করি, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করে বৈতরণি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে এই রাস্তা নির্মাণের কাজ স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে।








