সাতক্ষীরায় টানা অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় শিক্ষা, কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে পানি জমে থাকায় ৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পানিতে ভেসে গেছে অন্তত ১২৭টি মাছের ঘের।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পানি নিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, শ্রেণিকক্ষ এবং বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথ পানিতে তলিয়ে গেছে। এ কারণে ৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে।

বিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকার হাজারো শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুরা দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকলে তাদের পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে। অনেক এলাকায় বিদ্যালয়ের পথ পানিতে ডুবে যাওয়ায় শিশুদের যাতায়াতও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা না গেলে বিদ্যালয়গুলোর পাঠদান স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষা খাতের পাশাপাশি কৃষিতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকার ধানগাছ সম্পূর্ণ বা আংশিক পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে ধানগাছ পচে যাওয়া এবং ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা জানিয়েছেন, বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। এখন ফসল নষ্ট হলে উৎপাদন খরচও তুলতে পারবেন না তারা। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না হলে কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, জেলার বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ১২৭টি মাছের ঘের অতিবৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ঘেরের পাড় ডুবে যাওয়ায় চাষ করা মাছ বেরিয়ে গেছে। এতে মৎস্যচাষিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জেলা প্রশাসনের হিসাবে মৎস্য খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় অর্ধকোটি টাকা। তবে স্থানীয় মাছচাষিদের দাবি, মাঠপর্যায়ে ক্ষতির সঠিক হিসাব করা হলে এর পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

মৎস্যচাষিদের অনেকে ব্যাংকঋণ, সমিতির ঋণ এবং ধারদেনা করে ঘেরে মাছ চাষ করেছিলেন। ঘেরের মাছ ভেসে যাওয়ায় তারা এখন ঋণ পরিশোধ ও নতুন করে উৎপাদনে ফেরার বিষয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মাছচাষিরা সরকারি সহায়তা এবং সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন।

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, জেলায় এই মুহূর্তে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই। তবে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে যেসব এলাকায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি ও মাছের ঘেরের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, সাতক্ষীরা শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, পানি নিষ্কাশনের পথ সচল করা এবং প্রয়োজনীয় স্থানে খাল ও ড্রেন পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ চিহ্নিত করে সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সাতক্ষীরা একটি উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ জেলা। অতিবৃষ্টি হলেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষা, কৃষি ও মৎস্যনির্ভর মানুষের জীবিকা রক্ষায় স্থায়ী পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং খালগুলো দখলমুক্ত ও পুনঃখননের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

আহসানুর রহমান/এনএইচআর