বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে মেয়াদের পাঁচ বছরে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মেয়াদ শেষ করার আগেই প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বন্দোবস্ত হয়েছে। এসব প্রকল্পের কয়েকটি নির্মাণ পর্যায়ে চলে গেছে এবং কয়েকটি রয়েছে দরপত্র মূল্যায়ন পর্যায়ে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গৃহীত ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে নতুন করে হ্রাসকৃত মূল্যে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে হাত দেয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের শুল্কছাড় ও নীতিসহায়তার কারণে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা।

পিডিবির একজন কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে বলেন, গত জুন মাসে ছোট ও মাঝারি আকারের ১২টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এসব প্রকল্পের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৪৯৫ মেগাওয়াট। চলতি মাসের শেষ দিকে একটি লট এবং আগামী আগস্টের শেষ দিকে আরেকটি লটের দরপত্র চূড়ান্ত করা হবে।

বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্বে আসার পর নতুন-পুরোনো মিলিয়ে ৯১৮ মেগাওয়াটের ১২টি সৌর প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাতিল করে দেওয়া ছয়টি প্রকল্প। ফিরিয়ে আনা ওই ছয় প্রকল্পের পাশাপাশি ছয়টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম করে ঠিকাদারেরা প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজে হাত দিয়েছেন বলে জানান পিডিবির বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংক্রান্ত আইপিপি-১ সেলের পরিচালক গোলাম মর্তুজা।

নতুন সৌর প্রকল্পগুলোর জন্য পরিত্যক্ত জমির পাশাপাশি সরকারি ভবনের ছাদ, রেলস্টেশনের পতিত জমি এবং চলমান তেল-গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উন্মুক্ত এলাকা বেছে নেওয়া হচ্ছে; যেমন চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরে আড়াই মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ এবং ২ মেগাওয়াটের একটি ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র গত ৩০ জুন আহ্বান করা হয়েছে। কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় ৫০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট এলাকার জন্য আহ্বান করা হয়েছে ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র। একইভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাইপাস রেলওয়ে স্টেশনকে কেন্দ্র করে ৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের একটি প্রকল্প চলমান।

বিদ্যুৎসচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি। এই মুহূর্তে বিদ্যুতের উচ্চমূল্য থেকে বেরিয়ে আসতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। সরকার ইতিমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বাজেটে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম যোগ করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে রাতের বেলায়ও সৌরবিদ্যুতের সুবিধা কাজে লাগানো যায়।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বায়ুবিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎসহ সব ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে সরকার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র প্রস্তুত করছে। সেখানে এই খাতে বিনিয়োগ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব মিলবে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এর নীতিমালা প্রকাশ হতে পারে।

ছাদ প্রকল্পে সাড়া কম: সরকারি সব স্থাপনার ছাদ ব‍্যবহার করে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে প্রথম ধাপে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ছাদ ব্যবহার করা হবে। এই কাজে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগকে যুক্ত করা হয়েছে।

ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা। ৪৬ হাজার ৮৫৪টি প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৪৫৪ দশমিক ৬১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গত বছরের নভেম্বরে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। ডিসেম্বরের মধ্যে তার নিষ্পত্তি হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু বিনিয়োগের মুনাফা অর্জনের গ্যারান্টি না থাকায় আগ্রহী অনেক উদ্যোক্তা শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যান বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

পিডিবির নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিদপ্তরের পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, বর্তমান বাজেট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রে বেশ কিছু উদ্যোগ রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করবে। যেসব প্রতিবন্ধকতার কারণে ছাদে নেটমিটারিংয়ের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ থেমে গিয়েছিল, তা দূর হবে।

প্রসঙ্গত, নেটমিটারিং হচ্ছে সৌর প্যানেল থেকে নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে, তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ব্যবস্থা। এ জন্য গ্রাহক সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা পেয়ে থাকেন।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনার আলোকে যে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল, সেখানে কোনো দরদাতা পাওয়া যায়নি। নতুন সরকার যেভাবে নির্দেশনা দেবে, সে অনুযায়ী আমরা কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

আর ঢাকার উত্তরাংশে বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিত ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) সাড়ে ১২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের দরপত্র বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি নিজস্ব অর্থায়নেও তারা ঢাকার আগারগাঁওয়ে বিনিয়োগ ভবনের ছাদে ১৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বসিয়েছে।

ডেসকোর একজন কর্মকর্তা জানান, ১৪২টি বিদ্যালয়ের ছাদ ও ২৩টি হাসপাতালের ছাদে ডেসকো তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।