বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে কর্মচারী সংকটে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এ অঞ্চলের রোগীরা। কর্মচারী সংকট এতটাই তীব্র যে, প্রতিদিনই রোগীবাহী ট্রলি ও হুইলচেয়ার ঠেলে বিভিন্ন বিভাগে নিতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের। ট্রলিম্যান ছাড়াও ওয়ার্ডবয়, আয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, লিফট অপারেটর ও অফিস সহায়ক পদেও রয়েছে তীব্র সংকট। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটির চতুর্থ শ্রেণির অনুমোদিত পদের প্রায় ৫২ শতাংশ এবং তৃতীয় শ্রেণির প্রায় ৩৬ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির মোট প্রায় ৪৭ শতাংশ পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে।

গত ৫৮ বছর ধরে এ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও বাড়েনি জনবল। ৩৮৬ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার রোগীকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। ফলে হাসপাতালে এসে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন রোগীরা। এতে হাসপাতালের অন্যান্য সেবা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রোগী ও তাদের স্বজনদের।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ১৯৬৮ সালে ২৫০ শয্যা নিয়ে হাসপাতালটির যাত্রা শুরু হয়। পরে ৩৮৬ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়ে এটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পর্যায়ক্রমে হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা ৫০০ থেকে ১ হাজারে উন্নীত করা হলেও জনবল রয়ে গেছে সেই ৩৮৬ শয্যার কাঠামোতেই। বর্তমানে হাসপাতালের আন্তঃবিভাগে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বহির্বিভাগেও প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজারের বেশি রোগী সেবা নিচ্ছেন।

হাসপাতালের ৩৮৬ শয্যার জনবল কাঠামো অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণির অনুমোদিত ১৮৩টি পদের মধ্যে ৬৬টি পদ শূন্য রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির অনুমোদিত ৪১৪টি পদের মধ্যে ২১৬টি পদ শূন্য রয়েছে। দুই শ্রেণি মিলিয়ে মোট ৫৯৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ২৮২টি পদ শূন্য। অর্থাৎ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির মোট প্রায় ৪৭ শতাংশ পদ বর্তমানে শূন্য থাকায় জনবল সংকট কাটাতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২২২ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলেও সংকটের পুরোপুরি সমাধান হয়নি।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগী পরিবহণের জন্য তিন শিফটে রয়েছে ১৯ জন ট্রলিম্যান। এখানে তিন শিফটে ২১ জন ট্রলিম্যানের পদ থাকলেও আন্তঃবিভাগে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সংকট থাকায় দুজনকে সেখানে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এমনিতেই ট্রলিম্যানের পদসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে জরুরি বিভাগে রোগী এমনকি লাশ পরিবহণের ক্ষেত্রেও স্বজনদের ট্রলি ঠেলে নিতে দেখা যায়। হুইলচেয়ার পরিচালনার জন্যও অনেক সময় কর্মী পাওয়া যায় না। এতে রোগীর স্বজনদেরই দায়িত্ব নিতে হচ্ছে।

জনবল সংকটের কারণে শুধু রোগী পরিবহণই নয়, ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, রোগী ভর্তি ও ছাড়পত্র কার্যক্রমেও ধীরগতি দেখা দিচ্ছে। বয়স্ক ও গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে স্বজনদেরই অনেক সময় হুইলচেয়ার ও ট্রলি ঠেলে বিভিন্ন বিভাগে নিতে হয়। লিফট অপারেটর সংকটে রোগী ও স্বজনদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কর্মচারীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় সেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রোগীর স্বজন মনোয়ার বেগম অসুস্থ শাহজাহান নামে এক রোগীকে হুইলচেয়ারে ঠেলে নিতে নিতে বলেন, ‘রোগী শাহজাহানের কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। তিনি হাসপাতালে একা চিকিৎসা নিচ্ছেন। পঞ্চম তলায় তার অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হুইলচেয়ার ঠেলে নেওয়ার জন্য কোনো কর্মচারীকে পাইনি। তাই আমিই তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেছি।’

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত কামরুন নাহারের ছেলে সবুর খান বলেন, ‘হাসপাতালে এসে কোনো ট্রলিম্যানকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটি ট্রলির ব্যবস্থা করলেও তা বহনের জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। অনেকক্ষণ পর একজন ট্রলিম্যানকে পাওয়ায় রোগীকে সার্জারি বিভাগে নিয়ে যেতে পেরেছি।’

শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক একেএম মশিউল মুনীর বলেন, ‘পুরোনো অর্গানোগ্রামের জনবল দিয়ে হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে। জনবল সংকট নিরসনে আমরা নিয়মিত মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।’