পুরান ঢাকার ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাস। ১৯ আগস্ট শিক্ষার্থীদের ‘বিভব শক্তির সংরক্ষণশীলতা’ বোঝাতে শ্রেণিকক্ষে সরল দোলক ব্যবহার করছিলেন সহকারী শিক্ষক আবদুল্লাহ আল নাহিয়ান। দোলকের দোলন দেখিয়ে তিনি বোঝাচ্ছিলেন, শক্তির রূপান্তর ও সংরক্ষণশীলতার বিষয়টি।

শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বুঝতে পারছিল সহজেই। শিক্ষক আবদুল্লাহ আল নাহিয়ানের মতে, পাঠের সঙ্গে মিল রেখে সঠিক শিখন উপকরণ ব্যবহার করলে কঠিন বিষয়ও শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ হয়ে আসে।

কিন্তু দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর বড় অংশে এমন চিত্র নেই। শ্রেণিকক্ষে উপকরণ থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে পাঠ্য বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা যে বিষয় শেখার কথা, তা কতটা শিখছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সাম্প্রতিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে ৫ হাজার ৪৩১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৭৪৭টি বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম মনিটরিং (পরিবীক্ষণ) করা হয়।

এসব বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠ্য বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। শুধু উপকরণের সমস্যাই নয়, শিক্ষার্থীরা কী শিখছে ও শেখার অগ্রগতি কতটা, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থায়ও বড় দুর্বলতা দেখা গেছে। পরিদর্শন করা বিদ্যালয়গুলোর ৫২ শতাংশে ধারাবাহিক মূল্যায়নের রেকর্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না।

মাউশির প্রতিবেদনে শিখন উপকরণের ব্যবহার ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন—এ দুটি বিষয়কে গুণগত শিখন–শেখানোর প্রক্রিয়ার সবচেয়ে দুর্বল দিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মাউশি পরিদর্শন প্রতিবেদন বলছে, ২ হাজার ৭৪৭টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠ্য বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। শুধু উপকরণের সমস্যাই নয়, শিক্ষার্থীরা কী শিখছে ও শেখার অগ্রগতি কতটা, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থায়ও বড় দুর্বলতা দেখা গেছে। পরিদর্শন করা বিদ্যালয়গুলোর ৫২ শতাংশে ধারাবাহিক মূল্যায়নের রেকর্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না।

শিক্ষক ও শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু শিখন উপকরণের ঘাটতি নয়, শ্রেণিকক্ষে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। উপকরণ পাঠ্য বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে শিক্ষার্থীদের বিষয়টি বুঝতে সমস্যা হয়। এতে কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জিত না হয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

শিখন উপকরণ বলতে কী কী বোঝানো হয়েছে, তা ওই প্রতিবেদনে নেই। তবে শিক্ষকেরা একটি ধারণা দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, পড়াশোর বিষয়ভেদে শিখন উপকরণ নানা রকম। পদার্থবিজ্ঞানে ‘বিভব শক্তির সংরক্ষণশীলতা’ বোঝাতে সরল দোলক একটি উপকরণ। বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ে টেস্টটিউব, বিকার, ফানেল ও মেজারিং সিলিন্ডার, বিবর্ধক কাচ (ম্যাগনিফাইং গ্লাস), চুম্বক, তার, ছোট বাল্ব ইত্যানি নানা কিছুর দরকার হয়।

ঢাকার একটি সুপরিচিত বিদ্যালয়ের একজন বিজ্ঞানের শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা শিক্ষার্থীদের ব্যাঙের শরীর ব্যবচ্ছেদ শেখান। কিন্তু অনেক বিদ্যালয়ে সেটা সেখানো হয় না। এভাবে বিজ্ঞানের অনেক বিষয়ই শিক্ষার্থীদের না বুঝে মুখস্থ করতে হয়।

গ্রামে অথবা উপজেলা পর্যায়ে কী অবস্থা, তা জানতে যোগাযোগ করা হলে ঝিনাইদহ জেলার একটি উপজেলার একজন সহকারী পরিদর্শক প্রথম আলোকে বলেন, তিনি যখন একটি বিদ্যালয়ের কৃষিশিক্ষা বিষয়ের ক্লাসে যান, তখন দেখতে পান দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক কোনো উপকরণই ব্যবহার করেন না। কৃষিশিক্ষা বিষয়ে কী কী উপকরণ থাকার কথা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধরেন ধান রোপণ শেখানো হবে। সেটা সেখাতে চারার ব্যবস্থা করা যায়। তখন হাতে–কলমে শিক্ষাটা হবে।

স্কুলে অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার নিয়ে অস্বস্তি 
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)

মাউশির আওতাধীন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২০ হাজারের বেশি। তিন মাস অন্তর ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের (ডিএমএস) আওতায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখা। গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে পাঁচ হাজারের বেশি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক মনিটরিং প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের বই বাসায় নিয়ে পড়ার সুযোগ, শিক্ষক–কর্মচারীদের অননুমোদিত অনুপস্থিতি, যৌন হয়রানির অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিষয়টি মাউশির মহাপরিচালককে অবহিত করা হয়েছে।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষকেরা যেন পাঠদানের সময় সঠিক ও সংগতিপূর্ণ শিখন উপকরণ ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে বিদ্যালয়গুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে।

উপকরণ আছে, পাঠের সঙ্গে মিল নেই

শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় উপকরণ একেবারেই নেই—চিত্রটি এমন নয়। মাউশির পরিদর্শন করা ২ হাজার ৭৪৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৯৮টিতে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় উপকরণ রয়েছে। অর্থাৎ অধিকাংশ বিদ্যালয়ে কোনো না কোনো শিখন উপকরণ আছে। কিন্তু সেই উপকরণ দিয়ে শিক্ষক কী শেখাচ্ছেন এবং তা পাঠের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেখানেই বড় ঘাটতি।

পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৫৫৭টি বিদ্যালয়ে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিপরীতে ১ হাজার ১৯০টি বিদ্যালয়ে ব্যবহৃত উপকরণ পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

অসংগতিপূর্ণ উপকরণ ব্যবহারের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিদ্যালয় ঢাকা অঞ্চলে ৩২১টি। এরপর ময়মনসিংহে ২৪৯টি, খুলনায় ১৯৪, রংপুরে ১৯৩, বরিশালে ১৫৩, চট্টগ্রামে ১৩৫, রাজশাহীতে ১৩২, কুমিল্লায় ১১১ ও সিলেট অঞ্চলে ৬৯টি।

খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল, অধ্যাপক ও মাউশির মহাপরিচালকশিক্ষকেরা যেন পাঠদানের সময় সঠিক ও সংগতিপূর্ণ শিখন উপকরণ ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে বিদ্যালয়গুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে।

একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের চিত্রও প্রতিবেদনে আলাদাভাবে উঠে এসেছে। খুলনা অঞ্চলের ঝিনাইদহের শৈলকুপার একটি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির কৃষিশিক্ষা বিষয়ের ক্লাস মনিটরিংয়ের সময় দেখা যায়, ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। শুধু তা–ই নয়, শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণও সেখানে ছিল না। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত বিনা মূল্যের বা পরিত্যক্ত উপকরণও শ্রেণিকক্ষে দৃশ্যমান ছিল না।

যেনতেনভাবে চলছে কারিগরি শিক্ষা, ছয় শতাধিক প্রতিষ্ঠানে ভোকেশনাল শুধু কাগজেই

শ্রেণিকক্ষে উপকরণ থাকলেই শেখা নিশ্চিত হয় না

শ্রেণিকক্ষে উপযুক্ত শিখন উপকরণ ব্যবহার করলে পাঠ শুধু মুখস্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিক্ষার্থীরা বিষয়টি দেখে ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সহজে বুঝতে পারে। এতে শেখা দীর্ঘস্থায়ী হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও আগ্রহ বাড়ে, প্রশ্ন করার এবং শ্রেণিকক্ষে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু উপকরণ থাকা আর তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিষয়ভিত্তিক নির্দেশনায় শ্রেণিকক্ষে উপযুক্ত শিখন উপকরণ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মাউশির পরিদর্শনের তথ্য বলছে, বাস্তবে সেই নির্দেশনার সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের চিত্রের বড় ফারাক রয়েছে।

পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৫৫৭টি বিদ্যালয়ে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিপরীতে ১ হাজার ১৯০টি বিদ্যালয়ে ব্যবহৃত উপকরণ পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, শিখন কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের তৈরি বিভিন্ন উপকরণ প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষ বা বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত কিংবা দৃশ্যমান আছে। বাকি প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানে এসব উপকরণ নেই।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর সঙ্গে শিক্ষকের দক্ষতা ও প্রস্তুতির বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি প্রশিক্ষণের পর তাঁরা শ্রেণিকক্ষে সেই জ্ঞান ও কৌশল প্রয়োগ করছেন কি না, তার নিয়মিত অনুসরণও সব ক্ষেত্রে হয় না। ফলে অনেক শিক্ষক প্রচলিত পদ্ধতিতে বা দায়সারাভাবে পাঠদান করেন।

শিক্ষকসংকটে বাড়ছে চাপ

প্রশিক্ষণের ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষকসংকটও। কোনো বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণিতে ক্লাস নিতে হয়। এমনকি নিতে হয় অতিরিক্ত দায়িত্বও। এতে পাঠ প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত অগ্রগতি দেখা এবং পাঠের উপযোগী শিখন উপকরণ নির্বাচন ও ব্যবহারে সময় কমে যায়।

মাধ্যমিক পর্যায়ে, বিশেষ করে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট প্রকট। মাউশির তথ্য বলছে, দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে তিন হাজারের বেশি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদও খালি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষকের সংকট। আইসিটি বাধ্যতামূলক হওয়ার ১৩ বছর পরও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ বিষয়ের আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি। গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে আইসিটি পড়াতে হচ্ছে।

এস এম হাফিজুর রহমান, অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়শিখনফল অর্জনের ক্ষেত্রে শিখন উপকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিষয়টি বিবেচনার সময় দেখতে হবে, শিক্ষাক্রম অনুযায়ী কী ধরনের শিখন কার্যক্রম প্রত্যাশিত এবং সে অনুযায়ী উপকরণ তৈরি ও ব্যবহার হচ্ছে কি না। শিক্ষাক্রমের চাওয়া, শিখন উপকরণের নকশা ও পরিবীক্ষণ—এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, তিনি আইসিটির শিক্ষক নন। তারপরও তাঁকে এ বিষয়ের ক্লাস নিতে হয়। সম্প্রতি একদিন আইসিটির ক্লাস নেওয়ার সময় ইংরেজি বিষয়ের এক শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় একই সময়ে তাঁকে ইংরেজির ক্লাসও সামলাতে হয়েছে।

ওই শিক্ষক বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ থাকে। ক্লাস সামলানোই যখন কঠিন হয়ে পড়ে, তখন পাঠের জন্য উপযুক্ত শিখন উপকরণ নির্বাচন ও ব্যবহার করার দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।

শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষকসংকট, প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও প্রশিক্ষণের পর নিয়মিত তদারকির অভাব—এই বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, শ্রেণিকক্ষে শেখানোর মান উন্নত না হলে শুধু অবকাঠামো বা শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

আইসিটি পড়ান গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা, পদার্থের শিক্ষক, অনিয়মিত ব্যবহারিক ক্লাস

পাঠের পরিকল্পনাও হচ্ছে না, মূল্যায়নের হিসাবও নেই

ধারাবাহিক মূল্যায়নের উদ্দেশ্য শুধু নম্বর দেওয়া নয়; শিক্ষার্থী কোন বিষয় বুঝেছে, কোথায় দুর্বল এবং কোন জায়গায় তাকে আরও সহায়তা দিতে হবে, তা চিহ্নিত করা।

মাউশির প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দুই হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠের পরিকল্পনা অনুযায়ী শিখন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে প্রায় ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে তা হয় না। আর ৫২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক মূল্যায়নের রেকর্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না।

এর অর্থ কোনো শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে পিছিয়ে পড়লে সেটি শনাক্ত করে সময়মতো সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়াটিই অনেক বিদ্যালয়ে দুর্বল। এতে একজন শিক্ষার্থী কোনো একটি শ্রেণিতে যে ঘাটতি নিয়ে পরের শ্রেণিতে ওঠে, তা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। একসময় সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে যায়।

মাউশির তিন মাসের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। এ সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ৭১টি যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর একটি উচ্চবিদ্যালয়েই ১২টি অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই ঘাটতি শুধু বিদ্যালয়ের ফলাফলে প্রভাব ফেলে না। উচ্চশিক্ষায় গিয়ে বিষয় বুঝতে সমস্যা হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

অথচ শ্রেণিকক্ষে ভালোভাবে শেখানো নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীর শেখার বড় একটি অংশ বিদ্যালয়েই সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে বাড়তি কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভরশীলতাও কমানো সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

পাঠদানের শিক্ষক কম, প্রধান শিক্ষক নেই ৫৫% বিদ্যালয়ে

এক বিদ্যালয়েই ১২ যৌন হয়রানির অভিযোগ

মাউশির তিন মাসের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। এ সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ৭১টি যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর একটি উচ্চবিদ্যালয়েই ১২টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের একটি বিদ্যালয়ে ছয়টি, নারায়ণগঞ্জ সদরের একটি বিদ্যালয়ে পাঁচটি, বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার একটি বিদ্যালয়ে পাঁচটি ও টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের একটি বিদ্যালয়ে চারটি যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্য বিদ্যালয়গুলোয় এক থেকে তিনটি করে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে মাউশির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাউশির প্রতিবেদনে এ বিষয়ে প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এসব ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পত্র দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিখনের ঘাটতি শুধু বিদ্যালয়ের ফলাফলে প্রভাব ফেলে না; উচ্চশিক্ষায় গিয়ে বিষয় বুঝতে সমস্যা হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

শিক্ষাক্রম, উপকরণ ও পরিবীক্ষণের মধ্যে সমন্বয় দরকার

শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শেখানো নিশ্চিত করতে শুধু নতুন শিক্ষাক্রম, বই বা উপকরণ নয়; শিক্ষকের পর্যাপ্ততা, প্রয়োজনভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের বাস্তব প্রয়োগও নিয়মিত তদারক করতে হবে। এতে শিখনের ঘাটতি ও কোচিং–প্রাইভেট–নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শিখনফল অর্জনের ক্ষেত্রে শিখন উপকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিষয়টি বিবেচনার সময় দেখতে হবে, শিক্ষাক্রম অনুযায়ী কী ধরনের শিখন কার্যক্রম প্রত্যাশিত এবং সে অনুযায়ী উপকরণ তৈরি ও ব্যবহার হচ্ছে কি না।

এস এম হাফিজুর রহমানের মতে, শিক্ষাক্রমের চাওয়া, শিখন উপকরণের নকশা ও পরিবীক্ষণ—এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।

অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান আরও বলেন, পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত শিখন উপকরণ না থাকলে কিংবা সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার না করা হলে শিক্ষার্থীদের শিখনফলের ওপর বড় প্রভাব পড়ে। তাই মাউশির পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য গুরুত্ব দিয়ে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

মাউশির মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, মনিটরিং জোরদার করার পাশাপাশি যৌন হয়রানি রোধেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কমিটির বিষয়ে জোর দেওয়া, সচেতনতা বৃদ্ধি ও অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভাষাজ্ঞানে দুর্বল শিক্ষার্থীরা, পিছিয়ে শিক্ষা ও কর্মজীবনে