রানওয়ের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল এয়ারআস্ট্রার উড়োজাহাজ। কেবিন ক্রুর নিরাপত্তা ঘোষণাও শেষ। যাত্রীরা সিটবেল্ট বেঁধে উড্ডয়নের অপেক্ষায়। ঠিক তখনই কেবিনের ভেতরে শুরু হয় অস্বাভাবিক এক পরিস্থিতি। এক যাত্রী বেঁকে বসেন। ফ্লাইটটি থামাতে হবে। কারণ, তিনি বিয়ের শেরওয়ানি বাসায় ফেলে এসেছেন। কেবিন ক্রু তাকে জানান, জরুরি চিকিৎসা বা নিরাপত্তাজনিত বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া ট্যাক্সিওয়ে থেকে বিমান ফিরিয়ে আনার নিয়ম নেই। এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ওই যাত্রী। নিজের পরিচয় দেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফার্স্ট অফিসার হিসাবে। দেখান পরিচয়পত্র। পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে চাপ সৃষ্টি করেন বিমান থামাতে। শেষ পর্যন্ত সব নিয়ম, প্রটোকল ভাঙা হয়। প্রায় শখানেক যাত্রীর ভোগান্তি উপেক্ষা করে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী এয়ারঅ্যাস্ট্রার ফ্লাইট ২এ-৪১৫ ট্যাক্সিওয়ে থেকেই ঘুরিয়ে আবার টার্মিনালে আনা হয়। এভিয়েশন নিরাপত্তা বিশ্লেকদের মতে, উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত কোনো বাণিজ্যিক ফ্লাইট এভাবে ব্যক্তিগত কারণে ফিরিয়ে আনা আন্তর্জাতিক এভিয়েশন নীতিমালার পরিপন্থি। এ ঘটনা চরম ক্ষমতার অপব্যবহার। বিমান চলাচলের নিরাপত্তা বিধি ও অপারেশনাল প্রটোকলেরও লঙ্ঘন।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, এমন ঘটনা বিমানের নিরাপত্তা, প্রটোকল ও পেশাগত নৈতিকতা-এ তিন ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে যাত্রী নেমে গেলে তার লাগেজও নিরাপত্তা বিধি অনুযায়ী নামানো, পুনরায় সিকিউরিটি চেক এবং ঘটনাটির পূর্ণ তদন্ত করা উচিত।
বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা যুগান্তরকে বলেন, এটি অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টির খোঁজখবর নিচ্ছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ঘটনায় এয়ারআস্ট্রা এবং সংশ্লিষ্ট বিমানের পাইলট উভয়কেই তদন্তের আওতায় আনা হবে। যাত্রী হয়রানির বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
যেভাবে সূত্রপাত : শুক্রবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এয়ারআস্ট্রার ফ্লাইটটির চট্টগ্রামের উদ্দেশে উড্ডয়নের কথা ছিল। বোর্ডিং শেষে বিমানটি রানওয়ে অভিমুখে ট্যাক্সি করা শুরু করলে হঠাৎ করেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফার্স্ট অফিসার গোলাম রাব্বি প্রিন্স ফ্লাইট থেকে নেমে যেতে চান। নিয়ম অনুযায়ী অনুরোধ জানানো হলেও বিমান না থামায় তিনি নিজের অফিশিয়াল পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) দেখিয়ে হট্টগোল শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি ককপিটে গিয়ে নিজের পরিচয় দেন। অভিযোগ রয়েছে, এয়ারআস্ট্রার দায়িত্বে থাকা পাইলট তার পূর্বপরিচিত হওয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিমানটি থামানোর সিদ্ধান্ত নেন।
সেই ফার্স্ট অফিসার গোলাম রাব্বি প্রিন্স পরিবারের ৬ সদস্যকে নিয়ে চট্টগ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। তবে তাড়াহুড়োয় নিজের শেরওয়ানি বাসায় ফেলে আসেন তিনি। এ কারণে উড্ডয়নের প্রস্তুতি চলাকালেই তিনি বিমান থেকে নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার এই খামখেয়ালিপূর্ণ আচরণের কারণে ফ্লাইটে থাকা শিশু, বৃদ্ধসহ প্রায় একশ যাত্রী চরম ভোগান্তি ও দীর্ঘ বিলম্বের মুখে পড়েন। প্রায় ৩ ঘণ্টা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হয় তাদের। এ সময় শেরওয়ানি এনে পুনরায় বিমানবন্দরে ফেরার পর দুপুর প্রায় ১টার দিকে ফ্লাইটটি চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলেও যাত্রীদের জন্য এয়ারআস্ট্রার পক্ষ থেকে ন্যূনতম খাবার বা পানীয়ের ব্যবস্থাও করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন একাধিক যাত্রী।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার বিধি অনুযায়ী, গুরুতর জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া ট্যাক্সি শুরু হওয়ার পর বিমান ফিরে আসার সুযোগ নেই। এমনকি কোনো যাত্রী মাঝপথে নেমে গেলে নিরাপত্তার স্বার্থে ওই যাত্রীর সব লাগেজও বিমান থেকে নামিয়ে (অফলোড) পুনরায় নিরাপত্তা পরীক্ষা (সিকিউরিটি রি-চেক) করতে হয়। এর ফলে ফ্লাইটের আগের ক্লিয়ারেন্স বাতিল হয়ে যায় এবং নতুন করে স্লট নিতে হয়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘একজন যাত্রী অন্য একটি এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা হলেও এই ফ্লাইটে সাধারণ যাত্রী। হট্টগোল করলে পাইলট কেন বিমান ফিরিয়ে আনলেন, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাইলট ইন কমান্ড এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) তাকে ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যাত্রী’ হিসাবে রিপোর্ট করেছিলেন কিনা সেটিও তদন্ত করে দেখা দরকার।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ যুগান্তরকে বলেন, যাত্রীদের কিছুটা দুর্ভোগ হয়েছে, সেটি আমরা অস্বীকার করছি না। তবে কোনো যাত্রী অভিযোগ করলে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








