ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার রানাপাশা ইউনিয়নের ইসলামাবাদ গ্রামটি যেন ছোট্ট এক দ্বীপ। বিষখালী ও গজালিয়া নদীর মাঝখানে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এই গ্রামের মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত সংগ্রামের। নদীভাঙনে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এই জনপদে নেই কোনো সড়ক যোগাযোগ। চারপাশে নদীর পানি, মাঝখানে বসতভিটা---এভাবেই দিন কাটাচ্ছে ৪৫টি পরিবার।
একসময় এই গ্রামে ছিল বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, বসতভিটা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ২০১৬ সালের ভয়াবহ ভাঙনের পর ইসলামাবাদ গ্রামটি কার্যত মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরপর বিষখালী ও গজালিয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে হারিয়ে গেছে অনেকের শেষ সম্বল পর্যন্ত।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীভাঙনে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। তবে আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুলো এখনও শেষ আশ্রয়টুকু ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এখন পুরোপুরি নৌকানির্ভর।
গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহ আলম হাওলাদার বলেন, `একসময় আমাদের অনেক জমিজমা ছিল। নদীভাঙনে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন যে জায়গাটুকু আছে, সেটাও কখন নদীতে চলে যায় সেই ভয় নিয়ে থাকি। রাতেও শান্তিতে ঘুমাতে পারি না।'
রাবেয়া বেগম বলেন, `অসুস্থ রোগী হলে নৌকায় করে হাসপাতালে নিতে হয়। ঝড়-বৃষ্টির সময় নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সন্তানদের স্কুলে পাঠানোও কষ্টকর। আমরা চাই, সরকার দ্রুত ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিক।'
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাজার কিংবা জরুরি প্রয়োজনে তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় নৌকায়। বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। প্রতিকূল আবহাওয়ার সময় জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়।
গ্রামটিতে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে যোগাযোগ সংকট ও জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, একসময় শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও বর্তমানে সেখানে পড়াশোনা করছে মাত্র ৪০ জন।
রানাপাশা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জাকির হোসেন বলেন, `ইসলামাবাদের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছেন। অনেক পরিবার বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে চলে গেছে। যারা এখনও আছেন, তারা ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন। বিষয়টি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। দ্রুত নদীতীর রক্ষা ব্যবস্থা না নিলে অবশিষ্ট গ্রামটুকুও হারিয়ে যেতে পারে।'
এ বিষয়ে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এ. কে. এম. নিলয় পাশা আজকের পত্রিকাকে বলেন, `ইসলামাবাদ গ্রামটি মূলত নদীতে জেগে ওঠা একটি চর এলাকায় অবস্থিত। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড মূলত নদীর তীররক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। তবে এলাকাবাসী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে আবেদন পাওয়া গেলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাজেট চেয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।'
নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রিজভী আহমেদ সবুজ আজকের পত্রিকাকে বলেন, `বিচ্ছিন্ন জনপদের মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও মানবিক সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।'








