মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাস যেন মুহূর্তেই রূপ নিল এক বিষাদ সিন্ধুতে। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাতে মুখ ঢাকলেন নেইমার জুনিয়র। সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা যেন জানা ছিল না পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অধিনায়ক মার্কিনিয়োস কিংবা গোলরক্ষক আলিসন বেকারের। আরও একটি বিশ্বকাপ, আরও একটি ইউরোপীয় জুজু এবং আরও একবার কোটি কোটি সাম্বা ভক্তের হৃদয় ভাঙার গল্প।নরওয়ের কাছে ২-১ গোলের অবিশ্বাস্য হারে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের এই অকাল বিদায় শুধু একটি টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়া নয়; বরং এটি ব্রাজিলের ফুটবলের একটি ঐতিহাসিক ও সোনালী প্রজন্মের করুণ সমাপ্তির বার্তা। ২০০২ সালের সেই সোনালী ট্রফি জয়ের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৫ বছর, কিন্তু হেক্সা মিশন আজও অধরাই রয়ে গেল সেলেসাওদের।ইউরোপীয় বৃত্তে বন্দি ব্রাজিল: কান্নাভেজা বিদায় চার তারকারএবারের আসরে ব্রাজিলের দলটিতে অভিজ্ঞদের আধিক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৯৬২ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে বয়স্ক একাদশ নিয়ে মাঠে নেমেছিল তারা। তবে এই অভিজ্ঞতার ভারী সমীকরণ মাঠের বাস্তবতায় কোনো কাজে আসেনি। উল্টো ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়াম এবং ক্রোয়েশিয়ার পর এবার নরওয়ের কাছে হেরে ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে নকআউটে টানা ষষ্ঠ হারের তেতো স্বাদ পেল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এই হারের সঙ্গেই শেষ হয়ে গেল ব্রাজিলের চার মহাতারকার বিশ্বকাপ যাত্রা।আন্তর্জাতিক ফুটবলে পেলের রেকর্ড ভেঙে ৮০ গোলের মালিক হওয়া নেইমার ম্যাচের শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে গোল করেও দলকে রক্ষা করতে পারেননি। চোট আর ফিটনেসের সঙ্গে লড়াই করা এই জাদুকরের শেষ বিশ্বকাপ ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন মেটলাইফেই সমাধিস্থ হলো। নেইমারের মতোই হয়তো আর কখনো বিশ্বমঞ্চে দেখা যাবে না রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক মিডফিল্ড জেনারেল ৩৪ বছর বয়সী কাসেমিরোকে।রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী ও অধিনায়ক ৩২ বছর বয়সী মার্কিনিয়োস কিংবা ৩৩ বছর বয়সী বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলকিপার আলিসন বেকার; আগামী ২০৩০ বিশ্বকাপে এদের কারোরই খেলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এক বুক আক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চকে বিদায় জানাতে হচ্ছে এই তারকাদের।আনচেলত্তির ক্ষুরধার মস্তিষ্ক ও ব্রাজিলের নতুন শুরুর চ্যালেঞ্জসব হারানোর এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ব্রাজিলকে এখন তাকাতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। কোটি ভক্তের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—ব্রাজিল এখন কী করবে? তবে এখনই ভেঙে পড়ার কিছু নেই। সেলেসাওদের টেনে তোলার বিশাল দায়িত্ব এখন ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তির কাঁধে। ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসের সফলতম এই কোচের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর আস্থা রাখা ছাড়া ব্রাজিলের এই মুহূর্তে আর কোনো পথ নেই।প্রতিটি হারের পর হুটহাট কোচ বদলে ফেলার পুরনো সংস্কৃতি স্থায়ী কোনো সাফল্য বয়ে আনে না। বল দখলে রাখার ঐতিহ্যগত সামর্থ্য ব্রাজিলের আছে, তবে আনচেলত্তির মূল কাজ হবে মাঠের ছড়ানো-ছিটানো ব্যক্তিগত দক্ষতাকে একতাবদ্ধ দলীয় শক্তিতে রূপান্তর করা।ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে তরুণদের পায়ে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রদ্রিগোদের মতো উদীয়মান বিশ্বসেরা প্রতিভাদের গতি ও শক্তির সঙ্গে অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। বিশেষ করে, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণহীনতা দূর করতে চরম চাপের মুখেও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারা মিডফিল্ডার তৈরি করা এখন ব্রাজিলের প্রধান কাজ।সফল দলগুলো রাতারাতি সবকিছু ভেঙে ফেলে না, বরং আগের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নিজেদের বিবর্তিত করে। নেইমারদের বিদায়ের এই বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তর করে, নতুন প্রজন্মের হাত ধরে ব্রাজিল আবার ফুটবলের রাজমুকুট ফিরে পাবে; এমনটাই প্রত্যাশা ফুটবল বিশ্বের।
রাজনীতি
শেষ হলো নেইমারদের সোনালী প্রজন্ম, এবার কোন পথে ব্রাজিল?

শেয়ার করুন







