রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য দিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, শেষ রাতে নয়, ভোরের ফুটন্ত আলোতে ইয়াবা সেবন করতে দেখে ফেলায় মান-সম্মানের ভয়ে গণপতিকে প্রথমে হত্যা করেন গ্রেপ্তার দুই যুবক মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। পরে একে একে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। সর্বোচ্চ ৯টি ইয়াবা সেবন করে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে জানান পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে চারটি মরদেহ উদ্ধারের ছয় দিন পর দ্বিতীয়বারের মতো সাংবাদিকদের ডেকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন পুলিশ কমিশনার।

কমিশনার বলেন, আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তার বন্ধু ও কয়েকজন সাক্ষীদের জবানবন্দিতেও ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি পুলিশের।

পুলিশ কমিশনার আরো জানান, প্রতি শুক্রবার কর্মবিরতি থাকায় ইয়াবা সেবন করতো মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। ঘটনার রাতে তারা প্রথমে শান্ত নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে চারটি ইয়াবা কেনেন। প্রথমে তার বন্ধু সীমান্তের বাসায় ইয়াবা সেবন করে এরপর রাত ৩টার পরে ছাদ টপকে দেবুর বাসায় যান। সেখান থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন তারা। ওই রাতেই শিক্ষক গণপতির ছাদে বসে কয়েক দফায় ইয়াবা সেবন করেন মুগ্ধ সিদ্ধার্থ। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন সর্বোচ্চ নয়টি ইয়াবা সেবনের পর হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়।

কমিশনার আব্দুল মাবুদ বলেন, ইয়াবা সেবনের সময় ভোরে ছাদে উঠে গণপতি তাদের দেখে ফেলেন এবং এ নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। বিষয়টি প্রকাশ হয়ে গেলে মান-সম্মানের ভয়ে তারা প্রথমে গণপতিকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। এরপর তার স্ত্রী ও মেয়েকে ছাদে একই কায়দায় হত্যা করে। এরপর ছাদ থেকে নেমে ওই বাসার রুমে থাকা গণপতির পঞ্চম শ্রেণীর পড়ুয়া ছেলের সঙ্গে দেখা হয় সিদ্ধার্থ দাসের।

প্রিয়ম সিদ্ধার্থ দেখে নাম ধরে ডাকেন, সিদ্ধার্থ দাদা তুমি এখানে। এরপরেই দ্রুত প্রিয়মকে শ্বাসরোধে হত্যা করে ওই দুই যুবক বলে পুলিশের দাবি।

হত্যার পর গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে ছাদে ঢেকে রাখা হয় এবং স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির দরজার আড়ালে রাখা হয় বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানান পুলিশ কমিশনার।

এরপর বাড়িতে সিসিটিভির ক্যামেরা আছে কিনা, যদি রেকর্ড হয় সেই ভয়ে আসামি সিদ্ধার্থ বাসার নিচে নেমে একটি পুরাতন প্লাস দিয়ে বিদ্যুতের লাইন ডিসকানেক্ট করে। ফের উপরে উঠে এসে ওই বাসায় তারা অবস্থান করে। এ সময় তারা গোসলও করে ওই বাসায়।

কমিশনার জানান, ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে ডাকাতি হিসেবে চালিয়ে দিতে বাসার ভিতরে থাকা আসবাবপত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি এলোমেলো করে তারা। এসময় স্বর্ণালংকার নেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে পুলিশের বক্তব্যে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জানান, মুগ্ধ খোঁজাখুঁজি করে অলংকার নিয়ে আসে এবং সিদ্ধার্থ সেগুলো ব্যাগে ভরে। পরবর্তী সেই স্বর্ণালংকারগুলো মন্দিরের পাশেই একটি জায়গায় লুকিয়ে রাখে তারা।

কমিশনার জানান, গ্রেপ্তার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের ড্রাগ টেস্ট এবং ডিএনএ পরীক্ষার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে নিহত গণপতির স্ত্রী ও মেয়ের ফরেনসিক প্রাথমিক পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পরবর্তী পরীক্ষার পর পাওয়া যাবে বলেও জানান তিনি। 

এদিকে গণপতির ব্যাংকে থাকা অর্থের বিষয়েও তদন্ত করছে পুলিশ। ব্যাংক স্টেটমেন্ট উত্তোলনের জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে জানান কমিশনার।

পুলিশ কমিশনার আরো জানান, গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন ব্রাহ্মণ পরিবারের। তাই ওই দাস পাড়ায় ব্রাহ্মণ পরিবারের সঙ্গে স্থানীয় সিদ্ধার্থদের জাতিগত পার্থক্য থাকায় তাদের মধ্যে খুব একটা মেলামেশা ছিল না। দাস বংশের সঙ্গে ব্রাহ্মণ বংশের সামাজিক ব্যবধানের কারণে পারস্পরিক যোগাযোগে কিছুটা ফারাক ছিল।  রাস্তাঘাটে দেখা এবং কথাবার্তা হতো কিন্তু বাসায় যাতায়াত বা মেশার সুযোগ ছিল না। এ বিষয়টি নিয়েও আসামিদের মনে কোনো ধরনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বা অসন্তোষ ছিল কিনা বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

সিদ্ধার্থদের সঙ্গে জমি নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল কিনা সে বিষয়ে পুলিশ কমিশনার জানান, সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষদের কাছে জমি ক্রয় করে বাড়ি করেছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। সেই জমির টাকা পরিশোধে অংশীদাররা আনুপাতিক হারে টাকা কম পেয়েছে এমন একটা কথা উঠেছে। সেই বিষয়টা নিয়েও মনের মধ্যে তাদের একটি পঞ্জিভূত ক্ষোভ থাকতে পারে বলে ধারণা পুলিশের। তবে এ বিষয়টি হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর বাইরে ঘটনাটির পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তি বা শক্তি জড়িত ছিল কি না, সে বিষয়েও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে উল্লেখ করে কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও আলামত বিশ্লেষণ, আসামি ও সাক্ষীদের দেওয়া সাক্ষ্যগ্রহণের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ রংপুর মহানগর পুলিশের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাসুয়াপাড়া এলাকায় তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে সাবেক রংপুর জিলা স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।