দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মহান মুক্তিযুদ্ধের পর মুজিব সরকার ভারতের প্ররোচনায় তথাকথিত মস্কোপন্থি সমাজতন্ত্রের কবলে পড়ে স্বাধীন বাংলাদেশে শেয়ারবাজার চালু না করে সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করে মুজিব বাহিনীর লুটপাটের ব্যবস্থা করে দেয়। ফলস্বরূপ পাকিস্তান আমলের সব লাভজনক প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যায়। ফলে ১৯৭৪ সালে দেশব্যাপী দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ; যার ফলে ব্যাপক জনরোষের সৃষ্টি হয় এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুজিবীয় অপশাসনের সমাপ্তি ঘটে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের শাসনভার ন্যস্ত হয় স্বাধীনতার ঘোষক ’৭১-এর রণাঙ্গনের অকুতোভয় ও বীর সিপাহশালার জিয়াউর রহমানের ওপর।
জিয়াউর রহমান শাসনভার গ্রহণ করার পর প্রথমে বিদ্যুৎগতিতে সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তারপর দৃষ্টি দেন খাদের কিনারায় থাকা ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল করার দিকে। প্রথমে তিনি স্বাধীন দেশে চালু করেন শেয়ারবাজার তথা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। কারণ, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শেয়ারবাজার ছাড়া দেশের অর্থনীতির উন্নতি অসম্ভব। অতঃপর তিনি বুঝতে পারলেন, শুধু শেয়ারবাজার চালু করলেই হবে না, প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা; যার ফলস্বরূপ রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের একমাত্র বিনিয়োগ ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ তথা আইসিবি, যা দেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নে এবং শেয়ারবাজারের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ও পরিতাপের বিষয় হলো, বিগত দুই দশক এ প্রতিষ্ঠান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বুকভরা আশা ও স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে রয়েছে তার সুযোগ্য উত্তরসূরির নেতৃত্বে বিএনপি। তাই বর্তমান অবস্থায় আইসিবির কার্যকলাপ, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন এবং দেশের শেয়ারবাজারের করুণ দশা নিয়ে কিছু লিখতে বিবেক আমাকে বাধ্য করছে, যা কৌতূহলী পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরছি।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে অর্থনীতির বিকাশ এবং শিল্পায়নের জন্য আইসিবি প্রতিষ্ঠা ছাড়াও চালু করেন শেয়ারবাজারের অক্সিজেনখ্যাত মিউচুয়াল ফান্ড, যা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য আকর্ষণীয় মুনাফাভিত্তিক শিল্পায়নবান্ধব একটি সঞ্চয় প্রকল্প। মাফিয়া হাসিনার শাসনামলে শেয়ারবাজারের এ মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে পরিণত করা হয় শেয়ারবাজারের কার্বন-ডাই অক্সাইডে, যার জন্য আইসিবি অনেকাংশে দায়ী। মিউচুয়াল ফান্ড শেয়ারবাজারের অক্সিজেন হিসাবে দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও হাসিনার সভাসদ নাফিজ-রিয়াজ-দরবেশ সিন্ডিকেটের স্বার্থে আইসিবি সবাইকে নিয়ে নিজেরা অক্সিজেন গ্রহণ করেছে, আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য রেখেছে কার্বন-ডাই অক্সাইড সমৃদ্ধ মিউচুয়াল ফান্ড। যার ফলে হাসিনা সরকারের পতনের দীর্ঘ সময় পরও শেয়ারবাজার গতিশীল হচ্ছে না। তাছাড়া কথিত ওই চক্র শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বপ্নে গড়া আইসিবিকে পরিণত করে শেয়ারবাজারের ডাস্টবিনে। অথচ হাসিনার পতনের পর রাষ্ট্রীয় সব পর্যায় কম-বেশি সংস্কার, শুদ্ধি অভিযান এবং সাজার আওতায় এলে আইসিবি রয়ে গেছে এ কার্যক্রমের বাইরে। তাই এখন সময়ের দাবি, বিগত হাসিনা সরকারের সময় আইসিবির যেসব কর্মকর্তা ও পরিচালক মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন, তাদের ব্যাপারে বিএসইসি ও দুদকের মাধ্যমে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
এবার আসা যাক মাফিয়া-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইসিবি কর্তৃপক্ষ কীভাবে মিউচুয়াল ফান্ড ও শেয়ারবাজারকে আরও ডুবিয়েছে সে প্রসঙ্গে। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যেতে পারে, তবে এ ব্যাপারে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আজকের লেখাটা শেষ করব।
গত ১ জুন আমি আইসিবির মাননীয় চেয়ারম্যান স্যারের কাছে ফোনে জানতে চাই, সংশোধিত মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী আইসিবির আওতাধীন ক্লোজ এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ডগুলো ওপেন এন্ডেটে রূপান্তর বা অবসায়নের জন্য ইউনিট হোল্ডারদের বিশেষ সভা কবে? স্যার আমাকে জানান, বিএসইসি কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হবে। তাছাড়া স্যার আমাকে বলেন এ বিষয়ে আইসিবি এএমসিএলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জানতে। আমি স্যারের কথার প্রতি সম্মান জানিয়ে ওই কর্মকর্তার কাছে ফোনে জানতে চাই। তিনি আমাকে বলেন, ১২ জুন থেকে সভা ডাকা হবে। আমি তখন তাকে বলি, আইন অনুযায়ী ১২ জুনের আগে অবশ্যই সভা ডাকতে হবে এবং সভা ডাকার ১৪ দিনের মধ্যে সভা সম্পূর্ণ করতে হবে। আমি এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাকে ধমকের সুরে বলেন, আমি আইসিবির কর্মকর্তা, আপনি আমাকে আইন শেখাতে আসেন? আমি ১২ জুনের পর সভা ডাকব।
এখন আমার কথা হলো, এই যদি হয় সরকারের উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তার ভাষা, তাহলে আমরা যাব কোথায়? আর আমি তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই-তিনি যে প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত, আমি সেই প্রজাতন্ত্রের প্রজা।
আবদুর রহিম : অর্থনীতি বিশ্লেষক








