যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের অবস্থান তখন প্রায় দেড় মাস ছুঁইছুঁই। এই দীর্ঘ সফরের শুরু থেকেই একটি স্বপ্ন মনের গভীরে নীরবে বেড়ে উঠছিল। একদিন শিকাগোর স্বামীনারায়ণ মন্দির নিজের চোখে দেখব। আমেরিকার বুকে ভারতীয় শিল্প, ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও আধ্যাত্মিকতার এই অপূর্ব নিদর্শনের কথা বহুবার পড়েছি, অসংখ্য ছবি দেখেছি। তাই সেখানে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রতিদিনই যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছিল। সেই স্বপ্ন পূরণের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল বেশ কয়েক দিন আগে। গত সপ্তাহেই সুদীপ্ত পরিবারের সবাইকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সাত সিটের গাড়ি বুকিং দিয়েছিল। আগের রাতেই ঘোষণা হলো, পরদিন সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ছোট বড় সবার মধ্যেই তখন উৎসবের আমেজ। কে কোন পোশাক পরবে, পথে কোথায় থামা হবে, কী খাওয়া হবে, কে কোথায় বসবে, এসব নিয়েই চলছিল আনন্দময় ব্যস্ততা। কিন্তু ভোরের সেই উচ্ছ্বাসের মাঝেই হঠাৎ নেমে এলো অপ্রত্যাশিত বিষাদের ছায়া। আমরা যখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ফোন এলো গাড়ি ভাড়া দেওয়া প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। তারা দুঃখ প্রকাশ করে জানাল, যান্ত্রিক সমস্যার কারণে বুকিং করা সাত সিটের গাড়িটি দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু আজ নয়, আগামীকালও তাদের কাছে এমন কোনো গাড়ি খালি নেই। মুহূর্তের মধ্যেই সবার মুখের হাসি যেন মিলিয়ে গেল। মনে হলো, বহুদিনের লালিত স্বপ্নটি বুঝি শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যাবে।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর পরিবারের সবার মনোবল ফিরিয়ে দিলো আমাদের বড় মেয়ে মা মনি। দৃঢ় কণ্ঠে সে বলল, আমরা যাবই। গাড়ি ছোট হলে ছোটই হবে, তবু এই ভ্রমণ বাতিল করা যাবে না। সিদ্ধান্ত হলো, পাঁচ সিটের গাড়িতেই রওয়ানা দেব। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে রইল এক টুকরো কষ্ট। আদরের নাতনি বাঁশরী আর ছোট মেয়ে মৃত্তিকাকে বাসায় রেখেই যেতে হবে। তাদের রেখে যাওয়ার কথা ভাবতেই আমাদের সবার মন ভারী হয়ে উঠল। বিশেষ করে আমার স্ত্রীর। ঢাকা থেকে তিনি, আমার বেয়ান, বড় মেয়ে ও ছোট মেয়ের জন্য একই রং ও নকশার শাড়ি যত্ন করে নিয়ে এসেছিলেন। ইচ্ছা ছিল, সবাই সেই শাড়ি পরে একসঙ্গে মন্দিরে যাবে, এক ফ্রেমে বন্দি হবে একটি স্মরণীয় পারিবারিক মুহূর্ত। সেই ছবিটি আর পূর্ণতা পেল না। আনন্দের ক্যানভাসে যেন অদৃশ্য এক অপূর্ণতার রেখা থেকে গেল। তবু জীবন যেমন সব সময় পরিকল্পনা মেনে চলে না, ভ্রমণও তেমনি নিজের মতো করেই গল্প লিখে। মনকে সান্ত্বনা দিয়ে, অপূর্ণতার সামান্য বেদনা বুকের ভেতর লুকিয়ে আমরা সবাই গাড়িতে উঠে বসলাম। ২৭ জুন, শনিবার। ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক সকাল দশটা ছুঁয়েছে। স্টিয়ারিংয়ে সুদীপ্ত। ইঞ্জিন সচল হতেই ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল ওয়েস্ট লাফায়েতের চেনা পথঘাট। সামনে খুলে গেল বহুদিনের লালিত স্বপ্নযাত্রার দুয়ার, যার গন্তব্য শিকাগোর স্বামীনারায়ণ মন্দির।

mondir

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাটারাক্ট ফলসে স্মৃতিময় একদিন

গাড়ি তখন ইন্ডিয়ানার বিস্তীর্ণ সমতলভূমি পেরিয়ে ছুটে চলছে। দুপাশে যতদূর চোখ যায় সবুজ ভুট্টাক্ষেত আর সয়াবিনের মাঠ যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা বিশাল ক্যানভাস। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট খামারবাড়ি, লাল রঙের শস্যাগার, দূরে সারিবদ্ধ বনভূমি আর নিরিবিলি জনপদ পথের সৌন্দর্যকে আরও গভীর করে তুলছিল। প্রশস্ত আন্তঃরাজ্য মহাসড়কে প্রতিটি গাড়ি নিজ নিজ লেন মেনে এমন শৃঙ্খলায় এগিয়ে চলেছে যে মনে হচ্ছিল, এটি কেবল একটি সড়ক নয় বরং নাগরিক সচেতনতার চলমান প্রতিচ্ছবি। গাড়ির ভেতরে চলছিল হাসি, গল্প আর স্মৃতিচারণ। কখনো বাংলাদেশের স্মৃতি, কখনো আমেরিকার অভিজ্ঞতা, আবার কখনো বাঁশরীকে রেখে আসার আক্ষেপ। গল্পে গল্পেই প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ কখন যে অজান্তে ফুরিয়ে এলো, টেরই পেলাম না। ওয়েস্ট লাফায়েত থেকে আমাদের গন্তব্য ছিল প্রায় একশ ত্রিশ মাইল দূরের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের বার্টলেট শহরে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত স্বামীনারায়ণ মন্দির। সাধারণত এই পথ অতিক্রম করতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। ইলিনয়ে প্রবেশের কিছুক্ষণ পরই দূরে শিকাগোর আকাশছোঁয়া অট্টালিকাগুলো দিগন্তরেখায় ভেসে উঠল। মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি শহরের দিকে এগোচ্ছি না, বরং ইতিহাস, শিল্প, আধ্যাত্মিকতা ও স্থাপত্যের অনন্য জগতের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছি। বিশ্বব্যাপী পরিচিত মন্দিরটি পরিচালনা করে বোচাসনবাসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থা, সংক্ষেপে বিপিএস। ভগবান স্বামীনারায়ণ এখানে প্রধান উপাস্য। তবে এটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং ভারতীয় সংস্কৃতি, মানবসেবা, নৈতিক শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবেও সুপরিচিত।

শহরের কোলাহল পেরিয়ে যখন স্বামীনারায়ণ মন্দিরের প্রবেশদ্বারে পৌঁছলাম; তখন সত্যিই মনে হলো, আধুনিক আমেরিকার বুকের মধ্যে যেন হঠাৎ কয়েক হাজার বছরের ভারতীয় সভ্যতা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্র মার্বেলের অপরূপ স্থাপনাটি প্রথম দর্শনেই হৃদয়কে অভিভূত করে। সূর্যের আলোয় ঝলমল করা সাদা পাথর যেন নির্মলতার প্রতীক হয়ে চারপাশে অলৌকিক আবহ সৃষ্টি করেছে। প্রতিটি স্তম্ভ, প্রতিটি খিলান, প্রতিটি গম্বুজ, প্রতিটি ভাস্কর্য এমন সূক্ষ্ম নিপুণতায় খোদাই করা যে মনে হয় পাথর নয়, যেন শিল্পীর অনুভূতিই সেখানে রূপ পেয়েছে। লতা, পাতা, পদ্মফুল, নৃত্যভঙ্গি, পৌরাণিক প্রতীক আর জ্যামিতিক নকশার অপূর্ব সমন্বয়ে পুরো মন্দিরটি যেন পাথরে খোদাই করা অনন্ত মহাকাব্য। ভারতের রাজস্থান ও ইতালির উৎকৃষ্ট মার্বেল হাজার হাজার খণ্ডে খোদাই করে আমেরিকায় এনে দক্ষ কারিগর ও অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবীর অক্লান্ত শ্রমে এ স্থাপত্য গড়ে তোলা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির এ যুগেও শতাব্দীপ্রাচীন কারুশিল্পের এমন অনন্য প্রয়োগ সত্যিই বিস্ময় জাগায়।

mondir

আরও পড়ুন

আটলান্টা থেকে ওয়েস্ট লাফায়েত: পথে পথে জীবনের গল্প

মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করতেই বাইরের ব্যস্ত পৃথিবী যেন মুহূর্তেই হারিয়ে গেল। চারদিকে এক গভীর প্রশান্তি। ধূপের মৃদু সুগন্ধ, ভক্তিমূলক সংগীতের কোমল সুর এবং দর্শনার্থীদের নীরব পদচারণা মিলিয়ে সৃষ্টি করেছে অপার্থিব পরিবেশ। প্রার্থনাকক্ষের ছাদজুড়ে অসাধারণ অলংকরণ, সারিবদ্ধ খোদাইকৃত স্তম্ভ এবং সুসজ্জিত বেদি চোখে পড়তেই বোঝা যায়, এটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, শিল্প, দর্শন ও বিশ্বাসের এক অনুপম মিলনক্ষেত্র। মন্দির চত্বর ঘুরে জানতে পারলাম, এটি কেবল ধর্মীয় আচার পালনের স্থান নয়, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে ভারতীয় সংস্কৃতি, নৈতিক শিক্ষা, ভাষা, সংগীত এবং মানবসেবার আদর্শ পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আগত দর্শনার্থীদের স্বেচ্ছাসেবীরা আন্তরিকতার সঙ্গে মন্দিরের ইতিহাস, নির্মাণশৈলী এবং দর্শনের নানা দিক ব্যাখ্যা করে জানাচ্ছিলেন। ধর্মের সীমা অতিক্রম করে মানবিক মূল্যবোধের যে চর্চা এখানে হয়, সেটিই সম্ভবত এ মন্দিরের সবচেয়ে বড় শক্তি। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিটি কোণে সৌন্দর্যের প্রতি যত্নশীল স্পর্শ দেখে বারবার মনে হচ্ছিল, এখানে পরিচ্ছন্নতাও একধরনের সাধনা।

বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। বিদায়ের আগে শেষবারের মতো শুভ্র গম্বুজগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এই মন্দির শুধু পাথরের স্থাপত্য নয়, এটি মানুষের বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও শিল্পসাধনার জীবন্ত প্রতীক। বের হওয়ার আগে মন্দিরের রেস্তোরাঁ থেকে কিনে নিলাম পোহা। চিড়া, চিনাবাদাম, কারিপাতা আর নানা মসলার সমন্বয়ে তৈরি ভারতীয় এই জনপ্রিয় খাবারের স্বাদ ছিল একেবারেই ভিন্ন। মন্দিরের সবুজ লনে বসে সবাই মিলে পোহা খেতে খেতে দিনের নানা মুহূর্তের কথা মনে করে হাসি আর গল্পে মেতে উঠলাম। প্রকৃতির নির্মল পরিবেশ, মন্দিরের শান্ত আবহ আর পরিবারের সান্নিধ্যে সেই সাধারণ খাবারটুকুও যেন অসাধারণ আনন্দের অংশ হয়ে উঠল।

mondir

আরও পড়ুন

বাঁশরীর হাসিতে শেষ হওয়া দীর্ঘ আকাশযাত্রা

মন্দির থেকে বেরিয়েই ভিডিও কলে কথা হলো বাঁশরী ও মৃত্তিকার সঙ্গে। ফোন ধরেই বাঁশরীর একের পর এক প্রশ্ন, দাদু কোথায়, দিদু কোথায়, ঠাম্মী কোথায়। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে তার একটাই আবদার, তোমরা কখন আসবা, তাড়াতাড়ি চলে আসো। ওর কচি কণ্ঠের সেই সরল আকুতিতে আমাদের সবার মন ভরে উঠল। ওকে খুশি করার জন্য বললাম, আজ মন্দিরের আঙিনায় অনেক সুন্দর ময়ূর দেখেছি। তুমি এলে ওরা নিশ্চয়ই তোমার সামনে পেখম মেলে নাচত। কথাটি শুনে মুহূর্তেই ওর মুখে হাসি ফুটে উঠল। পাশে থাকা মৃত্তিকা শান্ত গলায় জানাল, প্রথমে বাঁশরী একটু কান্নাকাটি করেছিল। পরে আমি বলেছি, সবাই অফিসে গেছে, একটু পরই ফিরে আসবে। তারপর সে ঠিকমতো খেয়েছে এবং এখন ভালোই আছে। মৃত্তিকার এই দায়িত্বশীলতা ও স্নেহময় যত্ন আমাদের সত্যিই মুগ্ধ করল।

ফেরার পথে অস্তগামী সূর্যের সোনালি আলো ইলিনয় ও ইন্ডিয়ানার বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরকে অপরূপ রূপে রাঙিয়ে তুলেছিল। গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজেই দিনের শেষ আঁচড়ে নিঃশব্দ ছবি এঁকে চলেছে। হৃদয়জুড়ে দিনের অগণিত স্মৃতি আর অপার তৃপ্তি নিয়ে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আমরা নিরাপদে ওয়েস্ট লাফায়েতের মে ফেয়ারের বাসায় ফিরে এলাম। মনে হচ্ছিল, এই সফর শুধু একটি মন্দির দর্শনের নয় বরং পরিবার, ঐতিহ্য, শিল্প, আধ্যাত্মিকতা এবং ভালোবাসায় ভরা এমন এক অভিজ্ঞতার নাম, যা স্মৃতির অ্যালবামে আজীবন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

mondir

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রের লেক মিশিগানের তীরে বিকেলের উপাখ্যান

এসইউ