ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম কাজ কী? অনেকের উত্তর হবে মোবাইল ফোন হাতে নেওয়া। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, খবর, ভিডিও, বার্তা একটির পর একটি স্ক্রল করতেই কেটে যায় অনেকটা সময়। অফিসের কাজ কম্পিউটারে, অবসরে মোবাইলে, রাতে আবার সিরিজ বা ভিডিও-দিনের বড় একটি অংশই কেটে যাচ্ছে স্ক্রিনের সামনে।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম তৈরি করছে নতুন কিছু সমস্যা। চোখের ক্লান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত, মনোযোগ কমে যাওয়া, ঘাড় ও কোমরের ব্যথা, এমনকি উদ্বেগ ও মানসিক চাপও বাড়তে পারে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাটানোর কারণে। তবে ভালো খবর হলো, কয়েকটি ছোট অভ্যাস বদলালেই স্ক্রিন টাইম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। জেনে নিন এমনই ১০টি কার্যকর উপায়।
আরও পড়ুন
সোশ্যাল মিডিয়া ডে: ব্যবহার করছেন, নাকি ব্যবহৃত হচ্ছেন?
নিজের স্ক্রিন টাইম আগে জানুন
পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো নিজের অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া। অ্যান্ড্রয়েডের ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং বা আইফোনের স্ক্রিন টাইম ফিচারে দেখে নিন প্রতিদিন কত ঘণ্টা কোন অ্যাপে সময় দিচ্ছেন। অনেকেই অবাক হন, কারণ তারা ভাবেন দুই-তিন ঘণ্টা ব্যবহার করছেন, অথচ বাস্তবে তা ছয়-সাত ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায়।
অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন
প্রতিটি নোটিফিকেশন আমাদের মনোযোগ ভেঙে দেয়। একটি বার্তা দেখতে গিয়ে অনেক সময় ২০-৩০ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটিয়ে ফেলি। জরুরি নয় এমন অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। এতে ফোন বারবার হাতে নেওয়ার প্রবণতা কমবে।
দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করুন
ফাঁকা পেলেই ফোন ধরার অভ্যাস বদলান। দিনে দুই বা তিনটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন, যেমন সকালে ২০ মিনিট, দুপুরে ২০ মিনিট এবং রাতে ৩০ মিনিট। এই সময়ের বাইরে অকারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে না যাওয়ার চেষ্টা করুন।
আরও পড়ুন
কাঁদলে কি সত্যিই মন হালকা হয়?
খাবারের সময় ফোন দূরে রাখুন
পরিবারের সঙ্গে খাওয়ার সময় কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় ফোন ব্যবহার না করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে শুধু স্ক্রিন টাইমই কমবে না, সম্পর্কও আরও আন্তরিক হবে।
ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ করুন
মোবাইল, ট্যাব বা ল্যাপটপের নীল আলো ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মেলাটোনিন হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণে বাধা দিতে পারে।ঘুমানোর আগে বই পড়া, হালকা গান শোনা বা ধ্যান করার মতো অভ্যাস গড়ে তুলুন।
ফোনকে হাতের নাগালের বাইরে রাখুন
কাজ বা পড়াশোনার সময় ফোন টেবিলের ওপর না রেখে ব্যাগে বা অন্য ঘরে রাখুন। ফোন চোখের সামনে থাকলে সেটি ব্যবহার করার ইচ্ছাও বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন
আন্তর্জাতিক আতঙ্ক দিবস / ভয় নয়, আতঙ্কই নষ্ট করছে মানসিক শান্তি
বাস্তব জীবনের শখে ফিরে যান
অবসর মানেই স্ক্রিন-এই ধারণা বদলাতে হবে। বই পড়া, বাগান করা, রান্না, ছবি আঁকা, হাঁটাহাঁটি, সাইকেল চালানো বা কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখার মতো শখ আপনাকে স্ক্রিন থেকে দূরে রাখবে।
স্ক্রিন-মুক্ত কিছু সময় নির্ধারণ করুন
দিনের কিছু সময়কে ‘স্ক্রিন-ফ্রি জোন’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন। যেমন- ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম ৩০ মিনিট, রাতের খাবারের সময়, ঘুমানোর আগে এক ঘণ্টা- এই ছোট পরিবর্তনই বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
সপ্তাহে একদিন ডিজিটাল ডিটক্স করুন
পুরো দিন না পারলেও অন্তত কয়েক ঘণ্টা মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রেখে কাটানোর চেষ্টা করুন। এই সময়টুকু পরিবার, বন্ধু বা নিজের পছন্দের কাজে ব্যয় করুন। অনেকেই জানান, এতে মানসিক চাপ কমে এবং মন অনেক বেশি সতেজ লাগে।
নিজেকে ছোট লক্ষ্য দিন
হঠাৎ করে চার ঘণ্টার স্ক্রিন টাইম এক ঘণ্টায় নামানো কঠিন। বরং ধাপে ধাপে এগোন। যদি প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা ব্যবহার করেন, তাহলে প্রথম সপ্তাহে সেটি সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায়, এরপর পাঁচ ঘণ্টায় নামানোর চেষ্টা করুন। ছোট লক্ষ্য পূরণ করা সহজ, আর এতে দীর্ঘমেয়াদে অভ্যাস বদলানোও সম্ভব হয়।
আরও পড়ুন
স্ক্রিনে ডুবে যাচ্ছে শিশুর মানসিক বিকাশ
প্রযুক্তি আজ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজ, শিক্ষা, যোগাযোগ কিংবা বিনোদন-সব ক্ষেত্রেই এর প্রয়োজন রয়েছে। তাই লক্ষ্য প্রযুক্তি থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং প্রযুক্তিকে সচেতনভাবে ব্যবহার করা। ফোন, কম্পিউটার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের সময়কে সহজ করে দেবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি এগুলোই আমাদের সময়, মনোযোগ ও সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তাহলে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে।
জেএস/








