পাঠকের লেখা

বার্তাটা এসেছিল রাত তিনটায়।

‘সেক্টর ৭, পুরান ঢাকা। জৈব অবকাঠামো—অপসারণ নিশ্চিত করুন। সময়সীমা: ভোর ছয়টা।’

ফারিয়াদ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। জৈব অবকাঠামো! কী সুন্দর করেই না বলা হয়েছে! এর মানে গাছ। হ্যাঁ, সেই গাছ। সে জানত, এমন একটা দিন আসবে।

এক

২০৮০ সালের ঢাকা দেখলে চেনা যায় না। আকাশে উড়ছে হাজারো ড্রোন। কোনোটি পণ্য বহন করছে, কোনোটি মানুষ। রাস্তায় চাকাওয়ালা গাড়ি নেই বললেই চলে। ম্যাগনেটিক রেলে ভেসে চলছে যানবাহন। বুড়িগঙ্গা নদী এখন শুধুই একটি পাইপলাইন—পানি আসে, পানি যায়। তবে নদী বলতে যা বোঝায়, তার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। মানুষ আছে, কিন্তু রাস্তায় খুব কমই দেখা যায়। বেশির ভাগ মানুষ এখন কাজ করে নিউরোলিংক দিয়ে। মাথায় একটি ছোট্ট চিপ বসানো। ঘরে বসেই পুরো পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করে তারা।

গাছ? সে তো হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। অক্সিজেন আসে বায়োরিঅ্যাক্টর থেকে। শাকসবজি জন্মায় হাইড্রোপনিক টাওয়ারে। ছায়া দেওয়ার জন্য আছে সোলার শেড। প্রকৃতির আর কোনো কাজ নেই এই শহরে।

তবু সেই একটি গাছ ঠিকই টিকে ছিল। পুরান ঢাকার ৩৮ নম্বর গলিতে, প্রায় ধসে পড়া একটি পুরোনো মসজিদের দেয়ালের ফাটলে। একটি বটগাছ। বয়স কেউ জানে না। কেউ কেউ বলে, এর বয়স ২০০ বছর। কারও মতে আরও বেশি। শিকড় ঢুকে গেছে দেয়ালের একেবারে গভীরে। পাথর ভেঙে, সিমেন্ট সরিয়ে জায়গা করে নিয়েছে সে। যেন সে বলতে চাইছে, আমি যাব না।

কনভার্টার
নদী বলতে যা বোঝায়, তার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। মানুষ আছে, কিন্তু রাস্তায় খুব কমই দেখা যায়। বেশির ভাগ মানুষ এখন কাজ করে নিউরোলিংক দিয়ে। মাথায় একটি ছোট্ট চিপ বসানো।

দুই

ফারিয়াদ হোসেন, বয়স ৩৪। সে সিটি ক্লিয়ারেন্স ডিভিশনের একজন রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ার। তার কাজটা শুনতে বেশ সহজ মনে হয়। শহরের যা কিছু অপ্রয়োজনীয়—ভাঙা দেয়াল, পুরোনো স্থাপনা, জৈব বস্তু—তার সবকিছু সরিয়ে ফেলতে হবে। শহরকে পরিষ্কার রাখতে হবে। ফারিয়াদ গত পাঁচ বছর ধরে এ কাজই করে আসছে। তবে মনে মনে সে জানে, কাজটা তাকে ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।

ছোটবেলায় নানি বাড়িতে একটি আমগাছ ছিল। ফারিয়াদ সেই গাছে উঠত, পড়ত, এমনকি ঘুমাতও। এক দিন ঘুম থেকে উঠে দেখল, গাছটা আর নেই। নানি বলেছিলেন, ‘সিটি করপোরেশন কেটে নিয়ে গেছে।’ সেদিন ফারিয়াদ কাঁদেনি। কিন্তু তার ভেতরে কী যেন একটা ভেঙে গিয়েছিল। আজ রাতে সেই স্মৃতিটাই বারবার মনে পড়ছে তার। যন্ত্রপাতি গুছিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। সঙ্গে আছে চারটি ক্লিয়ারেন্স বট। ছয় ফুট লম্বা, টাইটানিয়ামের শরীর। এদের কাছে গাছ কাটা মানে শুধুই একটি কমান্ড।

গলিতে ঢুকতেই থমকে দাঁড়াল ফারিয়াদ। গাছটা দেখা যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে শহরের নিয়ন আলোর মাঝে গাছটিকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। পাতাগুলো নড়ছে, কিন্তু একটুও বাতাস নেই।

‘ইউনিট ওয়ান, এগিয়ে যাও।’

প্রথম বটটি সামনে এগোল। তারপর হঠাৎ থেমে গেল। সিস্টেম এরর। তিন, চার—সব কটি বটের একই অবস্থা। তারপর ফারিয়াদের মাথায় কিছু একটা হলো।

শব্দ
ছোটবেলায় নানি বাড়িতে একটি আমগাছ ছিল। ফারিয়াদ সেই গাছে উঠত, পড়ত, এমনকি ঘুমাতও। এক দিন ঘুম থেকে উঠে দেখল, গাছটা আর নেই। নানি বলেছিলেন, ‘সিটি করপোরেশন কেটে নিয়ে গেছে।’

তিন

এটাকে ঠিক স্মৃতি বলা যায় না। অনুভূতিও বলা চলে না। এটা যেন একটা ভাষা, যে ভাষায় কোনো শব্দ নেই, বাক্য নেই। আছে শুধু অনুভব। ফারিয়াদ দেখতে পেল—না, ঠিক দেখা নয়, সে অনুভব করল—একটি বীজ। মাটির গভীরে, অন্ধকারে পোঁতা। চারপাশে চাপ, শীত ও আর্দ্রতা। তারপর আলোর দিকে সেটির ধীর ও একগুঁয়ে এক যাত্রা।

সে অনুভব করল বৃষ্টি। শতবর্ষের বৃষ্টি—একসঙ্গে নয়, একটু একটু করে। প্রতিটি ফোঁটা আলাদা, প্রতিটির স্বাদও ভিন্ন। সে অনুভব করল মানুষের হাতের স্পর্শ। ছোট্ট একটি শিশুর হাত গাছের গায়ে আঁচড় কেটে নাম লিখছে। একজন বৃদ্ধ গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে ঘুমিয়ে আছেন। এরপর সে ভয় অনুভব করল। কংক্রিটের ভার, বিষাক্ত বাতাস আর একটু একটু করে কমে আসা পানির কষ্ট। চারপাশের সব সবুজ হারিয়ে যাওয়ার বেদনা। একাকিত্ব। যেন গাছটি বলছে, আমিই শেষ।

ডপেলগ্যাঞ্জার
ফারিয়াদ দেখতে পেল—না, ঠিক দেখা নয়, সে অনুভব করল—একটি বীজ। মাটির গভীরে, অন্ধকারে পোঁতা। চারপাশে চাপ, শীত ও আর্দ্রতা। তারপর আলোর দিকে সেটির ধীর ও একগুঁয়ে এক যাত্রা।

চার

ফারিয়াদ গাছের গোড়ায় বসে পড়ল। বৈজ্ঞানিকভাবে সে জানে এটি কী। গাছ মাইসেলিয়াল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। এটি মূলত মাটির নিচে থাকা ছত্রাকের সূক্ষ্ম সুতোর জাল। এই নেটওয়ার্ককে বলা হয় উড ওয়াইড ওয়েব। গাছ এই জাল দিয়ে রাসায়নিক সংকেত পাঠায়, পুষ্টি ভাগাভাগি করে এবং বিপদের বার্তা দেয়। কিন্তু এই গাছের নেটওয়ার্কে তো কেউ নেই। অন্য সব গাছ অনেক আগেই মরে গেছে। তাহলে?

ফারিয়াদ হাত দিয়ে মাটি খুঁড়ল। একবার, দুবার। তারপর থমকে গেল। মাটির নিচে সাদা সুতোর জালের মতো মাইসেলিয়াম। কিন্তু এই জাল কোনো একটা কিছুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। সরু ও ধাতব কিছু একটা। এটি একটি পুরোনো ফাইবার অপটিক কেবল। ১৯৯০-এর দশকের। ঢাকার প্রথম ইন্টারনেট লাইন। গাছের শিকড় সেই কেবলকে পেঁচিয়ে ধরেছে। এতটাই শক্ত করে যে দুটোকে আর আলাদা করা যায় না।

ফারিয়াদের মাথায় চিন্তাটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো। এই পুরোনো কেবল এখনো শহরের পুরোনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। গাছের শিকড় কেবলের মধ্য দিয়ে দুর্বল তড়িৎ–চৌম্বকীয় তরঙ্গ তৈরি করছে, ঠিক মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনের মতো। মাইসেলিয়াম সেই সংকেত বহন করছে। গাছটা কথা বলছে শহরের পুরোনো ডেটার সঙ্গে। ২০০ বছরের স্মৃতির সঙ্গে। আর এখন কথা বলছে ফারিয়াদের সঙ্গে।

ট্রাইসেরাটপস
ফারিয়াদ হাত দিয়ে মাটি খুঁড়ল। একবার, দুবার। তারপর থমকে গেল। মাটির নিচে সাদা সুতোর জালের মতো মাইসেলিয়াম। কিন্তু এই জাল কোনো একটা কিছুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে।

পাঁচ

ভোর হয়ে আসছে। ফারিয়াদের ফোনে একের পর এক বার্তা আসছে। সুপারভাইজার, ডিভিশন হেড ও অটোমেটেড রিমাইন্ডার।

‘কাজ সম্পন্ন হয়েছে?’

সে ফোনটা পকেটে রাখল। ক্লিয়ারেন্স বটগুলো এখনো অকেজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ জানে না কেন। ফারিয়াদ উঠে দাঁড়াল। গাছের দিকে তাকাল। কোনো বাতাস নেই, তবু পাতাগুলো এখনো নড়ছে।

সে কাজের রিপোর্টটি খুলল। এরপর টাইপ করল, ‘সেক্টর ৭। জৈব অবকাঠামো পরীক্ষা সম্পন্ন। স্থানটি ঐতিহাসিক অবকাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এটি অপসারণ করলে পুরোনো নেটওয়ার্ক লাইনের ক্ষতির আশঙ্কা আছে। বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। আপাতত কাজ স্থগিত রাখার সুপারিশ করা হচ্ছে।’

কথাটি পুরোপুরি মিথ্যা নয়। আবার সত্যিটাও সে আড়াল করেছে। আসল সত্যিটা হলো, গত পাঁচ বছর ধরে সে আসলে কী কী সরিয়ে ফেলেছে, তা আজ রাতে প্রথমবারের মতো বুঝতে পেরেছে ফারিয়াদ।

র‍্যানডম স্যাম্পল
সে ফোনটা পকেটে রাখল। ক্লিয়ারেন্স বটগুলো এখনো অকেজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ জানে না কেন। ফারিয়াদ উঠে দাঁড়াল। গাছের দিকে তাকাল। কোনো বাতাস নেই, তবু পাতাগুলো এখনো নড়ছে।

তিন মাস পর। ফারিয়াদ আর সিটি ক্লিয়ারেন্স ডিভিশনে নেই। সে এখন একটি ছোট্ট ল্যাবে কাজ করে। সঙ্গে আছে একদল তরুণ বায়োটেক গবেষক। তারা মাইসেলিয়াল নেটওয়ার্ক ও পুরোনো ফাইবার অপটিক কেবলের সংযোগ নিয়ে কাজ করছে। ধারণাটা বেশ অদ্ভুত, অনেকেই বিষয়টি নিয়ে হাসাহাসি করে। তবে প্রাথমিক ফলাফল সবাইকে চমকে দিয়েছে। গাছের সংকেত বিশ্লেষণ করে তারা এমন কিছু ডেটা পেয়েছে, যা এখনো পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। এটি শুধু রাসায়নিক সংকেত নয়। এর মধ্যে একটি বিশেষ ধরন আছে। সংকেতগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এটি যেন কিছুটা ভাষার মতো।

ফারিয়াদ সেদিন ল্যাব থেকে বের হয়ে সরাসরি পুরান ঢাকায় গেল। সেই ৩৮ নম্বর গলিতে। গাছটা এখনো আছে। সে গাছের গায়ে হাত রাখল। পাতা নড়ে উঠল। ঠিক তখনই এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল। ফারিয়াদের মাথায় একটি মুখ ভেসে উঠল। একেবারে স্পষ্ট অবয়ব। একজন বৃদ্ধ মানুষ। পরনে লুঙ্গি, হাতে চায়ের কাপ। তিনি গাছের নিচে বসে আছেন। ফারিয়াদ তাঁকে চেনে। এটি তার নানার ছবি।

তার নানা মারা গেছেন ২০ বছর আগে। ফারিয়াদের কাছে নানার কোনো ছবি নেই, পুরোনো এক বন্যায় সব হারিয়ে গেছে। কিন্তু গাছটা ঠিকই মনে রেখেছে। ফারিয়াদ থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে বুঝতে পারল, এই গাছের নিচে প্রতিদিন তার নানা বসতেন। বছরের পর বছর। গাছ সেই স্পর্শ মনে রেখেছে, সেই উষ্ণতা মনে রেখেছে। ২০০ বছর ধরে এই গাছ শুধু টিকেই থাকেনি, সে সবার কথা মনে রেখেছে। কিছু শিকড় থাকে, যা শুধু মাটির নিচেই যায় না; সময়ের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ে!

শান্তিপুরে অশান্তি