শিক্ষকদের সম্মানী পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষক সংসার চালাতে শিক্ষকতার পাশাপাশি দ্বিতীয় কোনো কাজ করতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, দ্বিতীয় কাজটি যাতে শিক্ষকদের করতে না হয় এবং তারা যাতে সঠিকভাবে তাদের সময় ও মেধা শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করতে পারেন, সেজন্য শিক্ষকদের সম্মানী বাড়ানো প্রয়োজন। পর্যায়ক্রমিক কাজটি করা হবে। এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হলে প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে এই বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য আছে। শিক্ষকের আর্থিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এখনো দেখি যে, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা তাড়াতাড়ি করে ক্লাস শেষ করে হয়তো আরেকটি সেকেন্ড জবে অথবা কৃষি কাজে যেতে হয়। তা না হলে তার সংসার চলে না। শিক্ষকরা যেন দ্বিতীয় কাজ করতে বাধ্য না হন এবং তাদের সময় ও মেধা শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করতে পারেন, সে জন্য তাদের সম্মানী বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষা খাতের আগের পরিস্থিতির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারের সময়ে শুধু ভবন হয়েছে, কিন্তু মানবসম্পদের উন্নয়ন হয়নি। তিনি বলেন, শিক্ষার মান বাড়াতে হলে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে। ময়মনসিংহ-৬ আসনের এমপি কামরুল হাসানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীন সফরে একটি চুক্তি সই হয়েছে। চীনের মানুষ কাঁঠাল খুব পছন্দ করে। বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল রপ্তানি করা হবে। মালয়েশিয়া সফরের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী জনাব আনোয়ার ইব্রাহিম কথা প্রসঙ্গে আমাকে জানিয়েছেন, উনাদের ওখানে একটি ফল হয় ডুরিয়ান, দেখতে অনেকটা কাঁঠালের মতন, কাঁঠালের কাজিন। কথা প্রসঙ্গে উনি আমাকে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া প্রতিবছর চীনে ওয়ান বিলিয়ন ডলারের ডুরিয়ান এক্সপোর্ট করে। তারা যদি পারে নিশ্চয়ই ইনশাআল্লাহ আমরাও কাঁঠাল রপ্তানি করতে পারব।

সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে দ্বিপাক্ষিক ফ্রন্টে মিয়ানমারের মূল জান্তা সরকারের পাশাপাশি সব পক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ স্থাপন ও আলোচনার বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাইকরণের কাজ নিয়মিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসন বা প্রত্যাবাসনের কার্যক্রমও চলামান আছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক বিষয়। আমরা সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের সঙ্গে সংলাপ জোরদার করেছি।

টাঙ্গাইল-৬ আসনের রবিউল আওয়ালের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বিরাজমান থাকায় ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগসহ থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

সরকার দলীয় এমপি এবিএম মোশাররফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, বিগত আওয়ামী লীগের আমলে দেশের শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনের কারণ উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বিশেষজ্ঞ, বিনিয়োগকারী সংগঠন এবং বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, হাজার হাজার বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব করার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করাসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের পরিকল্পনা আছে। শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে। দায়ীদের চিহ্নিত করে মামলাসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শেয়ার মার্কেট কারসাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসাবে ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকা পুঁজিবাজারের বৈষম্য নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা। পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। তিনি বলেন, কয়েকজন বিশেষজ্ঞকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পাশাপাশি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকেও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, আওতায় ট্যাংক ও সাঁজোয়া যুদ্ধযান সংযোজনের মাধ্যমে স্থলযুদ্ধ সক্ষমতা, আধুনিক আর্টিলারি, রকেট ব্যবস্থা এবং ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র সংযোজনের মাধ্যমে দূরপাল্লায় নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা এবং স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজনের মাধ্যমে আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে। পাশাপাশি মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা সংযোজনের ফলে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ ও পরিস্থিতি অনুধাবন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। বিমানযোগে অভিযান পরিচালনা, আকাশপথে সৈন্য ও সরঞ্জাম স্থানান্তর এবং নদীপথে সৈন্য ও সরঞ্জাম পরিবহণের সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর কৌশলগত ও অপারেশনাল গতিশীলতা আরও সুদৃঢ় হবে। সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন আছে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে। যা, জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। বিমান বাহিনীর অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংযোজনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এ ছাড়াও উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করে ফাস্ট ট্রাক প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এনসিপির আখতার হোসেনের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, স্থানীয় প্রতিরক্ষা শিল্প নির্মাণের জন্য আলাদা ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (ডিআইজেড) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন। তিনি বলেন, জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের সরকার দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জামায়াতের মাছুম মোস্তফার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন চলমান অগ্রাধিকারমূলক প্রক্রিয়া। এই উদ্দেশ্যে ৩ বছর এবং পরবর্তী ৭ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

সংসদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় প্রধানমন্ত্রীর : জাতীয় সংসদের অধিবেশন দেখতে আসা দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে কুশল বিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার বিকালে সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা জানান, সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী জিঞ্জিরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের লেখাপড়ার খোঁজখবর নেন। আগামী দিনে দেশ গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে শিক্ষার্থীদের নিজেদের দক্ষ, যোগ্য ও আদর্শ নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। কেবল পুঁথিগত বিদ্যাই নয়, এর পাশাপাশি শারীরিক শিক্ষা, ক্রীড়া এবং শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার জন্যও তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য, বর্তমান বিএনপি সরকারের বিশেষ উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি ও অধিবেশন সরাসরি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবন পরিদর্শনে আসেন।

দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে এসে শিক্ষার্থীরা এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী ঘুরে দেখেন। এরপর তারা সংসদ লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন এবং সংসদ ভবনের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে স্মৃতিচারণমূলক ছবি তোলেন। পরবর্তীতে তারা সরাসরি গ্যালারিতে বসে জাতীয় সংসদের অধিবেশন উপভোগ করেন। এ সময় সরাসরি সংসদ অধিবেশন দেখার এমন ব্যতিক্রমী ও শিক্ষণীয় সুযোগ করে দেওয়ার জন্য জিঞ্জিরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।