বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তৈরি পোশাক উৎপাদক হিসেবে বাংলাদেশ এরই মধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে ভবিষ্যতের সাফল্য নির্ভর করবে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, টেকসই উৎপাদন, দক্ষ মানবসম্পদ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ওপর।
জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডার্স অ্যালায়েন্সের (বায়লা) সভাপতি আবরার হোসেন সায়েম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভি।
সাক্ষাৎকারে তিনি ফিউচার সামিট ২০২৬ আয়োজনের উদ্দেশ্য, খাতটির বর্তমান অবস্থা এবং এর উন্নয়নে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।
আবরার হোসেন সায়েম তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের একজন তরুণ উদ্যোক্তা, ফ্যাশন-টেক প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এবং সায়েম গ্রুপ ও সায়েম ফ্যাশনস লিমিটেডের পরিচালক।
বায়লা আগামী ২০ ও ২১ জুলাই ফিউচার সামিট ২০২৬ আয়োজন করতে যাচ্ছে? এর মূল লক্ষ্য কী?
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে আমরা এরই মধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছি। তবে ভবিষ্যতের সাফল্য নির্ভর করবে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, টেকসই উৎপাদন, দক্ষ মানবসম্পদ, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে কত দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে পারি তার ওপর।
আরও পড়ুন
ঘুরে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই বায়লা ফিউচার সামিট-২০২৬ আয়োজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিল্পখাতের নেতৃত্ব, তরুণ পেশাজীবী, নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ ও উদ্ভাবকদের এক মঞ্চে এনে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে কীভাবে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।
আমাদের লক্ষ্য নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটানো, পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরি করা ও বাংলাদেশের ২০৩০ সালের শিল্প রোডম্যাপ প্রণয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ কী?
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা অনেক। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা পরিবর্তনের এই সময়ে বাংলাদেশ শুধু কম খরচের উৎপাদনকেন্দ্র নয়, বরং বিশ্বের সবচেয়ে টেকসই, নির্ভরযোগ্য ও আস্থাভাজন পোশাক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে পরিণত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে শুধু দাবি করলেই হবে না। এ অবস্থান ধরে রাখতে হলে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। উদ্ভাবন বাড়াতে হবে, টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে।
আরও পড়ুন
অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪.২৫ শতাংশ
এলডিসি থেকে উত্তরণ, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যারা দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে, তারাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে।
তরুণ নেতৃত্ব কীভাবে উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে?
তরুণদের রয়েছে নতুন চিন্তা, প্রযুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে কাজ করার সাহস। উদ্ভাবন শুধু প্রযুক্তির মাধ্যমে আসে না, এটি আসে নতুনভাবে চিন্তা করা, সমস্যা সমাধানের নতুন পথ খুঁজে বের করা ও পরিবর্তনকে গ্রহণ করার মানসিকতা থেকে আসে।
আজকের তরুণ উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীদের যদি যথাযথ প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে তারাই বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হবে। এ লক্ষ্য নিয়েই বায়লা কাজ করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশের পোশাক শিল্প কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবে এখনো অনেক পথ বাকি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনকে হুমকি হিসেবে নয়, বরং উৎপাদনশীলতা, পণ্যের মান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশকে টপকে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় ভিয়েতনাম
যেসব প্রতিষ্ঠান আজ প্রযুক্তি, তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ জনশক্তিতে বিনিয়োগ করবে, তারাই আগামী দিনের শিল্প নেতৃত্ব দেবে। এখন প্রশ্ন- প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হবে কি না তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কত দ্রুত এই পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে পারি।
বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে কোন বিষয়গুলোতে অগ্রাধিকার দিতে হবে?
বর্তমানে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশকে টেকসই উৎপাদন, উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
পাশাপাশি বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের মোট ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক থাকে এবং নতুন বাজারে প্রবেশ সহজ হয়।
আরও পড়ুন
চ্যালেঞ্জের বছরেও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে, ধীরগতিতে তৈরি পোশাক
একই সঙ্গে আধুনিকায়নের জন্য সহজ শর্তে বৈশ্বিক অর্থায়ন ও উদ্ভাবনী তহবিলের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে দেশের উচ্চ ঋণ ব্যয়ের প্রভাব কমানো যায়। এসব লক্ষ্য অর্জনে সরকার, কূটনৈতিক মিশন, ব্যবসায়ী সংগঠন ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এখনই কার্যকর টাস্কফোর্স ও বাস্তবমুখী অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সময়।
ফিউচার সামিট ২০২৬ থেকে কোন ধরনের ফলাফল প্রত্যাশা করছেন?
আমাদের কাছে সাফল্যের মানদণ্ড শুধু অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নয়। আমরা চাই, প্রতিটি অংশগ্রহণকারী নতুন ধারণা, কার্যকর অংশীদারত্ব ও বাস্তবসম্মত কৌশল নিয়ে ফিরুক, যা তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগাতে পারবেন।
দুদিনের এ আয়োজনের পরও আলোচনা যেন থেমে না যায়। তাই মূল বক্তব্য, সাক্ষাৎকার এবং গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা থেকে মানসম্মত জ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি করে ডিজিটাল মাধ্যমে পুরো শিল্পখাতের সঙ্গে ভাগাভাগি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইইউ বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের হিস্যা এখন ২১.৫৭ শতাংশ
আমাদের লক্ষ্য, ফিউচার সামিট ২০২৬ যেন প্রতিবছর শিল্পের জ্ঞান বিনিময়, নেতৃত্ব বিকাশ ও রূপান্তরের অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
ভবিষ্যৎ শিল্প নেতৃত্ব গড়ে তুলতে বায়লার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী?
বায়লার লক্ষ্য শুধু একটি সম্মেলন আয়োজন করা নয়। আমরা বাংলাদেশে এমন একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ধারাবাহিক শিক্ষা, গবেষণা, নীতিগত সংলাপ, উদ্ভাবন, নেটওয়ার্কিং ও শিল্পখাতের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি হবে।
আমাদের স্বপ্ন হলো এমন একটি সম্প্রদায় গড়ে তোলা, যেখানে উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী ও শিল্প বিশেষজ্ঞরা একে অপরের কাছ থেকে শিখবেন, অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন এবং বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করবেন।
দীর্ঘমেয়াদে আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক, উদ্ভাবনী ও টেকসই পোশাক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ভবিষ্যতের নেতৃত্বে বিনিয়োগ করা।
আইএইচও/এএসএ/ এমএফএ







