প্লাস্টিক বর্জ্য উৎসস্থল থেকেই পৃথকীকরণ না হওয়ায় দেশে রিসাইক্লিং শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল।

তিনি বলেন, অপরিচ্ছন্ন ও মিশ্র বর্জ্য সংগ্রহের কারণে সেগুলো পরিষ্কার এবং আলাদা করতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পুনর্ব্যবহৃত (রিসাইকেলড) কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদনের ব্যয় নতুন (ভার্জিন) কাঁচামালের চেয়েও বেশি পড়ে যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে মানসম্মত বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও সরকারি নীতিগত সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ‘বাংলাদেশে টেকসই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও অংশীদারদের দায়িত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি একথা বলেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে। গোলটেবিল বৈঠকের মিডিয়া পার্টনার ছিল জাগোনিউজ২৪.কম।

কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার ১০০ কেজির বেশি হলেও বাংলাদেশে তা মাত্র ১০ থেকে ১১ কেজি। তবে পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্লাস্টিক দূষণ একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ প্লাস্টিক উৎপাদন, ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহার—তিনটিই করে জানিয়ে তিনি বলেন, পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটিকে নানান প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা উৎসস্থল থেকেই প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করা যায় না। ফলে নিম্নমানের ও অপরিচ্ছন্ন বর্জ্য সংগ্রহ হয়, যা রিসাইকেল উপযোগী করতে অতিরিক্ত ব্যয় ও সময় লাগে।

প্লাস্টিক রিসাইকেলগোলটেবিল আলোচনায় আলোচকরা/ছবি: জাগো নিউজ

পাশাপাশি জনসচেতনতার অভাব রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্য দেশেও প্লাস্টিক ব্যবহার হয়, কিন্তু সেখানে মানুষ যত্রতত্র সড়ক, নদী বা জলাশয়ে প্লাস্টিক ফেলে না।

কামরুজ্জামান কামাল বলেন, দেশে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক ব্যবহৃত হলেও সেগুলো সংগ্রহের কোনো সংগঠিত ব্যবস্থা নেই। পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত বর্জ্য ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল। এ খাতে বড় বিনিয়োগও আসছে না। ফলে মানসম্মত বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং উৎপাদিত পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামাল ও পণ্যের মানও কাঙ্ক্ষিত হচ্ছে না।

বর্তমানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা রিসাইক্লিংয়ে বিনিয়োগ করলেও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এগিয়ে আসেনি জানিয়ে তিনি বলেন, বড় আকারের প্ল্যান্ট স্থাপন করলে আন্তর্জাতিক মানের রিসাইকেল কাঁচামাল ও পণ্য উৎপাদন সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে পিইটি রিসাইক্লিং হলেও উৎপাদিত কাঁচামাল ফুড গ্রেড নয় বলে জানান কামরুজ্জামান কামাল। তিনি বলেন, এর ফলে খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিংয়ে তা ব্যবহার করা যায় না। এজন্য বিদেশ থেকে ভার্জিন কাঁচামাল কিংবা রিসাইকেলড পিইটি আমদানি করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকার অনেক ক্রেতা তাদের পণ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ রিসাইকেলড কাঁচামাল ব্যবহারের শর্ত দিচ্ছেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে সেই মানের কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না।

নিম্নমানের ও অপরিচ্ছন্ন বর্জ্য সংগ্রহের কারণে সেগুলো পরিষ্কার ও পৃথকীকরণে অতিরিক্ত ব্যয় হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রিসাইকেলড পণ্যের উৎপাদন খরচ ভার্জিন কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্যের চেয়েও বেশি পড়ে বলে জানান তিনি।

উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ না হওয়ায় বাড়ছে প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের খরচপ্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল/ছবি: জাগো নিউজ

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এই বিপণন পরিচালক বলেন, দেশে যেসব রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ধারাবাহিক সরবরাহ নেই। ফলে অনেক প্ল্যান্ট পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা যাচ্ছে না।

রিসাইকেলড পণ্য ব্যবহারে দেশের মানুষের মধ্যে এখনো নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের ভোক্তারা পরিবেশবান্ধব হওয়ায় রিসাইকেলড পণ্যের জন্য অতিরিক্ত মূল্য দিতেও প্রস্তুত থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশে অনেকেই এখনো রিসাইকেলড পণ্য ব্যবহার করতে চান না। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন প্রাণ-আরএফএলের বিপণন পরিচালক। তিনি বলেন, স্বল্প সুদে ঋণ, বিনিয়োগ প্রণোদনা ও অনুকূল নীতিগত সহায়তা দেওয়া হলে এ খাতে বড় বিনিয়োগ আসতে পারে।

কামরুজ্জামান কামাল আরও বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশনগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের সময় সব ধরনের আবর্জনা একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয় এবং ডাম্পিং স্টেশনেও পৃথকীকরণের কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

সংগ্রহ থেকে শুরু করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত একটি সুসংগঠিত ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বর্জ্য ও কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা) রাজিনারা বেগমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান। অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খালেদ হাসান, পরিচালক (প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা) এ কে এম রফিকুল ইসলাম, পরিচালক (পরিকল্পনা শাখা) মো. হাসান হাসিবুর রহমান, পরিচালক (আইটি) মো. সাদিকুল ইসলাম, উপ-পরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা) ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (বিপিসিএল) প্রধান নির্বাহী খাদেম ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিব আহমেদ, বুয়েটের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাকিল আক্তার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল কাদের ইবনে কামাল, বিইউপির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়া, ইউনিলিভার বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রকিউরমেন্ট লিড দিলরুবা আহমেদ চৌধুরী, ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী, লাফার্জ হোলসিমের ডেপুটি ম্যানেজার (জিওসাইকেল) তামরিন চৌধুরী, নেসলে বাংলাদেশের এইচআর ডিরেক্টর হোসনে আরা লোমা, ম্যারিকো বাংলাদেশের ডিরেক্টর (লিগ্যাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) রাশেদ এহসান, ওয়েস্ট কনসার্নের কো ফাউন্ডার ও ডিরেক্টর ইফতেখার এনায়েতুল্লাহ, জাগো নিউজের সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক, সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার জাহিদুর রহমান প্রমুখ বৈঠকে অংশ নেন।

এসএম/এএসএ/ এমএফএ