একসময় শুক্রবার মানেই ছিল প্রেক্ষাগৃহের সামনে উৎসব। নতুন সিনেমা মুক্তি পেলে সকাল থেকেই টিকিট কাউন্টারের সামনে ভিড় জমত। রিকশা, বাস কিংবা পায়ে হেঁটে মানুষ ছুটে যেতেন কাছের প্রেক্ষাগৃহে। শহর থেকে মফস্বল-সিনেমা ছিল সাধারণ মানুষের সবচেয়ে সহজলভ্য বিনোদন। আজ সেই দৃশ্য অনেকটাই স্মৃতি।

ঢাকার পুরোনো কোনো সিনেমা হলের সামনে দাঁড়ালে সেই স্মৃতির ছায়া এখনো চোখে পড়ে। বিবর্ণ পোস্টার, বন্ধ গেট, ধুলোমাখা লবি আর ভাঙাচোরা দেয়াল যেন এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের সাক্ষী। একসময় যেখানে দর্শকের করতালি আর শিসে মুখর থাকত পরিবেশ, সেখানে এখন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। অন্যদিকে রাজধানীর আধুনিক মাল্টিপ্লেক্সগুলোর সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। হাতে পপকর্ন, কফির কাপ আর স্মার্টফোন নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তরুণ-তরুণী, পরিবার কিংবা বন্ধুরা। সিনেমা দেখতে যাওয়াটা এখন শুধু একটি বিনোদন নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক অভিজ্ঞতা, অনেকের কাছে জীবনধারার অংশ। বাংলাদেশের সিনেমা প্রদর্শন ব্যবস্থার এ রূপান্তর শুধু প্রেক্ষাগৃহের পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি বদলে যাওয়া দর্শক, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিরও গল্প।

দেশে একসময় দেড় হাজারের কাছাকাছি প্রেক্ষাগৃহ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরের বহু প্রেক্ষাগৃহ এখন বন্ধ। কোথাও গড়ে উঠেছে শপিং কমপ্লেক্স, কোথাও কমিউনিটি সেন্টার, আবার কোথাও বহুতল ভবন। কেন এই পতন? প্রথমত, অধিকাংশ সিঙ্গেল স্ক্রিন প্রেক্ষাগৃহ সময়ের সঙ্গে নিজেদের আধুনিক করতে পারেনি। ভাঙা চেয়ার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিুমানের শব্দব্যবস্থা, পুরোনো প্রজেক্টর এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ ক্রমেই পরিবারভিত্তিক দর্শকদের দূরে সরিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, স্যাটেলাইট টেলিভিশন, ইউটিউব, স্মার্টফোন ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিস্তার দর্শকদের বিনোদনের বিকল্প তৈরি করে দেয়। ফলে একসময়কার জমজমাট ব্যবসা ধীরে ধীরে অলাভজনক হয়ে ওঠে। যে প্রেক্ষাগৃহগুলো একসময় এলাকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল, সেগুলো এখন অনেক ক্ষেত্রেই শুধুই অতীতের স্মারক।

সিঙ্গেল স্ক্রিনের পতনের সমান্তরালে বাংলাদেশে উত্থান ঘটেছে মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতির। রাজধানীতে স্টার সিনেপ্লেক্সের যাত্রার মাধ্যমে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তা এখন দেশের সিনেমা ব্যবসার প্রধান ধারা। এরপর ব্লকবাস্টার সিনেমাস, লায়ন সিনেমা’সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাজারে আসে। মাল্টিপ্লেক্স দর্শকদের দিয়েছে নতুন এক অভিজ্ঞতা। আরামদায়ক আসন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, উন্নত ডিজিটাল প্রজেকশন, ডলবি সাউন্ড এবং পরিচ্ছন্নতা-সব মিলিয়ে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা আগের চেয়ে অনেক বেশি উপভোগ্য হয়েছে। এ সংস্কৃতি এখন আর শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, সিলেটসহ বিভিন্ন শহরে আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর সিনেমা প্রদর্শন খাতে নতুন বিনিয়োগ ও নতুন সম্ভাবনার জন্ম হয়েছে।

তবে এ উন্নয়নের পেছনে একটি প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারা মাল্টিপ্লেক্সে যাচ্ছেন? একসময় ৮০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যেই সিনেমা দেখা সম্ভব ছিল। এখন মাল্টিপ্লেক্সে একটি টিকিট কিনতে খরচ হয় ন্যূনতম সাড়ে চারশ থেকে হাজার টাকারও উপরে। সঙ্গে পপকর্ন, কফি কিংবা যাতায়াত খরচ যোগ করলে একটি পরিবারের জন্য সিনেমা দেখা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ফলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত দর্শকরা আবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরলেও নিু আয়ের মানুষের বড় একটি অংশ ধীরে ধীরে এ বিনোদন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। যে সিনেমা একসময় ছিল গণমানুষের শিল্পমাধ্যম, সেটি এখন অনেক ক্ষেত্রে নগরকেন্দ্রিক ও নির্দিষ্ট শ্রেণিভিত্তিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

নতুন প্রজন্মের কাছে সিনেমা দেখা এখন আর শুধু দুই-তিন ঘণ্টার গল্প দেখার বিষয় নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আউটিং। সিনেমা শুরু হওয়ার আগে সেলফি, আকর্ষণীয় পোশাকে ছবি তোলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা-সবকিছু মিলিয়ে একটি সামাজিক আয়োজন তৈরি হয়। মাল্টিপ্লেক্সের নান্দনিক পরিবেশ সেই অভিজ্ঞতাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘হাওয়া’, ‘প্রিয়তমা’ ও ‘তুফান’-এর মতো সিনেমা মুক্তির সময় এ প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। সিনেমা ঘিরে দর্শকদের উচ্ছ্বাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা এবং অনলাইন রিভিউ এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে সিনেমা এখন শুধু পর্দায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি ডিজিটাল আলোচনারও অংশ।

একইসঙ্গে বদলে যাচ্ছে সিনেমার ভাষাও। দর্শক যেমন বদলেছে, তেমনি বদলাচ্ছে সিনেমা নির্মাণের ধরনও। আধুনিক মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকদের রুচি মাথায় রেখে নির্মাতারা এখন আরও পরিশীলিত প্রযুক্তি, উন্নত ভিজ্যুয়াল এবং আন্তর্জাতিক মানের উপস্থাপনার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। শহুরে গল্প, উচ্চ প্রযোজনা ব্যয়, গ্ল্যামারাস উপস্থাপনা এবং ওটিটি-প্রভাবিত নির্মাণশৈলী ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্মাতাদের অনেকেই মনে করেন, মাল্টিপ্লেক্সের দর্শক প্রযুক্তিগত মান ও গল্প বলার ধরনে বেশি সচেতন। ফলে সিনেমা শিল্পের সামগ্রিক মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে এর বিপরীতে একটি উদ্বেগও রয়েছে। গ্রামীণ জীবন, প্রান্তিক মানুষের গল্প কিংবা একসময় জনপ্রিয় বাণিজ্যিক ধারার সিনেমাগুলো ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ সিনেমার বাজার যেমন প্রসারিত হচ্ছে, তেমনি রুচির নতুন এক কেন্দ্রও তৈরি হচ্ছে। তাই বলা যায়, রূপান্তরের এ সময়ে বাংলাদেশের সিনেমা শিল্প এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে পুরোনো সিঙ্গেল স্ক্রিনের স্মৃতি, অন্যদিকে ঝকঝকে মাল্টিপ্লেক্সের ভবিষ্যৎ। আধুনিক প্রেক্ষাগৃহগুলো নিঃসন্দেহে সিনেমা শিল্পকে নতুন মর্যাদা দিয়েছে, দর্শকদের আবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। কিন্তু সিনেমা যদি সত্যিই গণমানুষের শিল্প হয়, তাহলে তার দরজাও সবার জন্য খোলা থাকতে হবে। টিকিটের দামকে আরও সহনীয় করা, জেলা পর্যায়ে সাশ্রয়ী মাল্টিপ্লেক্স বা মিনিপ্লেক্স গড়ে তোলা এবং বৈচিত্র্যময় দর্শকের জন্য সিনেমা নির্মাণ, এসবই হতে পারে আগামী দিনের পথ। কারণ রুপালি পর্দার জাদু তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার আলো শহরের অভিজাত শপিংমল থেকে শুরু করে দূরবর্তী মফস্বলের সাধারণ মানুষের মুখেও সমানভাবে প্রতিফলিত হয়।