বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ)। কিন্তু সবচেয়ে বড় এই বাজারে দেশের অবস্থান নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমেছে। একই সঙ্গে কমেছে পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্যও।
ইইউতে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ ১০ দেশ হলো চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত প্রথম পাঁচ মাসে এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি সর্বোচ্চ প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে চীনের রপ্তানি প্রায় ৪ শতাংশ ও ভিয়েতনামের মাত্র দেড় শতাংশ কমেছে।
পোশাকের গড় মূল্য কমার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থা ভীষণ খারাপ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আগে রয়েছে শুধু পাকিস্তান। জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকের গড় মূল্য কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ, যা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ। অন্যদিকে তুরস্কের রপ্তানি করা পোশাকের গড় মূল্য ১ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে নিত্যপণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের চাহিদা কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের রপ্তানিতেও। তবে প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি বেশি কমে যাওয়া উদ্বেগের।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্যে দেখা যায়, গত জানুয়ারি–মে পাঁচ মাসে ইইউর মোট তৈরি পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ইউরো।
এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে ৭ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কম। শুধু মূল্য নয়, পরিমাণের দিক থেকেও রপ্তানি কমেছে। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৫২ কোটি কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ কম।
অন্যদিকে একই সময়ে চীন ইইউতে ৯ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। দেশটির রপ্তানি কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ।
আরশাদ জামাল, চেয়ারম্যান, তুসুকা গ্রুপব্যবসার সামগ্রিক পরিস্থিতি খারাপ থাকায় কম দামে ক্রয়াদেশ নেওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এতে রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমছে। একবার ক্রয়াদেশ হারালে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরও তা ফিরে পেতে ৩-৪ বছর সময় লাগেইউরোস্ট্যাটের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এ ছাড়া ভারতের ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ভিয়েতনামের ১ দশমিক ৫১ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১৭ শতাংশ কমেছে।
এই সময়ে ইইউর আমদানি করা প্রতি ইউনিট বা প্রতি কেজি তৈরি পোশাকের গড় মূল্য ছিল ১৯ দশমিক ৬৯ ইউরো। বাংলাদেশের রপ্তানি করা পোশাকের গড় মূল্য ছিল ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরো, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ কম। অন্যদিকে চীনের গড় মূল্য কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি ২৯ দশমিক ৪৪ ইউরো গড় মূল্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ভিয়েতনাম, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া তুরস্কের গড় মূল্য বেড়েছে ১ দশমিক ৮১ শতাংশ, যা কম্বোডিয়ার ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ ও ইন্দোনেশিয়ার ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
জানতে চাইলে তুসুকা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি আরশাদ জামাল বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের কারণে ইইউর ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রয়াদেশ কম দিয়েছে। এরপর যুদ্ধের কারণে চাহিদা কমেছে। ব্যাংকের বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে অনেক মাঝারি কারখানা কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খুলতে পারেনি। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটও মারাত্মকভাবে ভোগাচ্ছে। এসব কারণে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশের আকর্ষণ কমছে।
আরশাদ জামাল আরও বলেন, ব্যবসার সামগ্রিক পরিস্থিতি খারাপ থাকায় কম দামে ক্রয়াদেশ নেওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এতে রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমছে। তাঁর ভাষ্য, একবার ক্রয়াদেশ হারালে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরও তা ফিরে পেতে তিন-চার বছর সময় লাগে। তাই এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।




