চলচ্চিত্রকে শুধু বিনোদন বা সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যম হিসেবে না দেখে, একে একটি শক্তিশালী উৎপাদনমুখী শিল্প হিসেবে বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানান, সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে সিনেমা খাতের বিকাশ ঘটানো গেলে এ খাতে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব।

আজ শনিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এ তথ্য জানান আলোচকেরা।

‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি: স্লোগান নাকি সম্ভাবনা’ বিষয়ে আয়োজিত এ ওয়েবিনার সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।

ওয়েবিনারে প্যানেল আলোচক হিসেবে ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ক্রিয়েটিভ উদ্যোক্তা তানিম নূর, নাট্যকার ও অভিনেতা বাকার বকুল, হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদ বিন আবদুস সালাম।

শিল্পকলা একাডেমিগুলো স্মরণসভায় বেশি ব্যবহার

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে শুধু প্রথাগত ও একমাত্রিক অবকাঠামোগত ধারণা নিয়ে এগোলে চলবে না। আবার শিল্পকে শুধু ‘বিশুদ্ধতার’ সংকীর্ণ ধারণায় আটকে রাখাও কার্যকর হবে না। দেশে এই খাতের জন্য পর্যাপ্ত দর্শক, ভোক্তা এবং অর্থ খরচ করতে রাজি থাকা মানুষ আছেন। সরকার যদি সঠিক অবকাঠামো ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোয়, তবে এই খাতকে টেকসই করা সম্ভব।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ আমলাতান্ত্রিক মানসিকতায় পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো স্মরণসভা বা এ–জাতীয় কাজেই বেশি ব্যবহার হয়, যা থেকে কোনো রাজস্ব আসছে না।

১০ লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

ওয়েবিনারে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার পরিচালক তানিম নূর জানান, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রকে অর্থনীতির বাইরে শুধু ‘সংস্কৃতি চর্চা’ হিসেবে দেখা হয়েছে। সত্তর বা আশির দশকে দেশের সিনেমাশিল্পের সুবর্ণ সময়ে এ খাতে প্রায় দুই লাখ মানুষ যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, হল এবং পোস্ট–প্রোডাকশন, ভিএফএক্স বা ভিএফএসের মতো নতুন প্রযুক্তি মিলিয়ে চলচ্চিত্র খাতে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। এর মাধ্যমে এই খাতের বাজারের আকার ৫ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা সম্ভব। তখন সরকারও বছরে ৫০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে। তবে এ জন্য সঠিক সরকারি নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে জানান তানিম নূর।

এক সিনেমায় ১৫ লাখ গাড়ির আয়

অনুষ্ঠানে দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ টেনে তানিম নূর বলেন, ১৯৯৩ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জুরাসিক পার্ক’ দক্ষিণ কোরিয়ায় মুক্তি পায়। তখন দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হিসাব করে দেখেন যে এই একটি সিনেমার আয় প্রায় ১৫ লাখ ‘হুন্দাই সেডান’ গাড়ি বিক্রির অর্থের সমান। এরপরই কোরিয়া সরকার চলচ্চিত্রকে একটি সেবা খাতের পরিবর্তে উৎপাদনমুখী শিল্প হিসেবে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এর সুফল হিসেবে আজকে বিশ্বজুড়ে কোরিয়ান চলচ্চিত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

এক কোটি টাকার কনটেন্টে কর ২৭ লাখ টাকা

‘চরকি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্মাতা রেদওয়ান রনি দেশীয় কনটেন্ট ও ওটিটি–শিল্পে কর ব্যবস্থার অসংগতি এবং বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এক কোটি টাকার একটি ওটিটি কনটেন্ট তৈরি করতে ২৭ লাখ টাকা কর হিসেবে চলে যায়। আবার ওটিটি খাতের জন্য আলাদা কোনো নিবন্ধনব্যবস্থা ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। এই সুযোগে নেটফ্লিক্সের মতো বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলো কর ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা করছে, আর দেশীয় প্রতিষ্ঠান করের বোঝা বইছে।

আন্তর্জাতিক পেমেন্ট জটিলতা নিয়েও সমস্যায় পড়ছেন বলে জানান রেদওয়ান রনি। তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশ থেকে দর্শক ‘চরকি’ দেখছেন এবং ৩৬টিরও বেশি আন্তর্জাতিক মুদ্রায় পেমেন্ট আসছে। কিন্তু বাংলাদেশে পেপাল বা স্ট্রাইপ মাধ্যম সচল না থাকায় আন্তর্জাতিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের পেমেন্ট সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকে আসতে পারে না। বাধ্য হয়ে অন্য কোনো দেশের পার্টনারের মাধ্যমে আমাদের এই পেমেন্ট নিতে হয়। ফলে আয়ের একটি বড় অংশ দেশের বাইরেই থেকে যায়।

অন্যরা যা বলেন

সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল খাতের (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) টেকসই বিকাশের জন্য কাঠামোগত সংস্কার এবং একটি কেন্দ্রীয় কমিশন গঠন করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। একই সঙ্গে তিনি শিল্পীদের মেধাস্বত্ব ও রয়্যালটি নিশ্চিত করতে আইনি প্রয়োগ চেয়েছেন।

ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, বর্তমানে বাজারে প্রিন্ট পাইরেসির পাশাপাশি ডিজিটাল পাইরেসি বা অনলাইনে বইয়ের অবৈধ কপি ছড়ানোর প্রবণতা মহামারি আকার ধারণ করেছে, যা প্রকাশকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।

নাট্যকার ও অভিনেতা বাকার বকুল বলেন, যে শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল সরকারের, তারা এটিকে সব সময় একটা ‘প্রোপাগান্ডা মেশিন’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। প্রতিটি সরকারই কালচারাল অ্যাকটিভিজমের নামে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে।

ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদ বিন আবদুস সালাম বলেন, হস্তশিল্পের বড় সুবিধা হলো কর্মসংস্থানের জন্য মানুষের ঢাকা আসার প্রয়োজন হয় না। কাঁচামাল যেখানে সহজলভ্য, মানুষ সেখানেই ঘরে বসে আয় করতে পারছেন।