আফরান নিশো, চঞ্চল চৌধুরী, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব বা মেহজাবীন চৌধুরীর মতো ছোটপর্দার এক সময়ের একচ্ছত্র রাজারা এখন আর ঈদের গড়পড়তা নাটকে সহজে ধরা দিচ্ছেন না। তাদের পুরো মনোযোগ এখন ওটিটির প্রিমিয়াম কনটেন্ট ও বিগ-বাজেট থিয়েটার রিলিজের দিকে। এই স্টারডম শিফট নিয়ে সিনেমা ও ওটিটির শীর্ষ অভিনেতা আফরান নিশো নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, ‘শিল্পীর কাজের ক্যানভাস বড় হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। ওটিটি বা সিনেমায় আমরা যে বাজেট, সময় এবং স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্টের সুযোগ পাই, তা এখনকার টেলিভিশনের খণ্ড নাটকে সম্ভব নয়। ১০-১৫টি নাটকে গতানুগতিক কাজ করার চেয়ে একটি মানসম্পন্ন সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ করা অনেক বেশি তৃপ্তিদায়ক। তবে হ্যাঁ, এর ফলে ছোটপর্দায় একটা বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং দর্শকরা টিভি স্ক্রিন থেকে ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে শিফট করছেন।’ তবে এই নতুন মাধ্যমেও নিজের দাপট বজায় রেখেছেন ছোটপর্দার রোমান্টিক কিং জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। নিজের কাজ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ওটিটিতে কাজ করছি মানে এই নয় যে, টেলিভিশন নাটককে ছোট করে দেখছি। যুগের প্রয়োজনে যেখানে ভালো বাজেট ও আন্তর্জাতিক মানের গল্প তৈরি হচ্ছে, শিল্পীরা সেখানেই যাবেন। তবে ঈদের নাটকের যে চিরচেনা আমেজ বা ফ্যামিলি অডিয়েন্স, সেটা ওটিটির ক্রাইম-থ্রিলারের ভিড়ে যেন হারিয়ে না যায়, আমাদের সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আমি নাটকেও কাজ করছি, আবার ওটিটির বড় প্রজেক্টেও ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছি।’

প্রথমসারির তারকারা ওটিটি ও বড়পর্দায় পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে পড়ায় ছোটপর্দার নাটক ও টেলিফিল্মগুলোর হাল ধরার চেষ্টা করছেন একঝাঁক নতুন ও সম্ভাবনাময় তরুণ তারকা। এরইমধ্যে তৌসিফ, জোভান, মুশফিক আর ফারহান, খাইরুল বাসার, সাদিয়া আয়মান, কেয়া পায়েল, তটিনী, নাজনীন নিহা, কিংবা আইশা খানরা দর্শকদের মাঝে সাড়া ফেলেছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক জনপ্রিয় নাটক উপহার দেওয়া অভিনেতা ফারহান আহমেদ জোভান বলেন, ‘সিনিয়র ভাইরা অন্য মাধ্যমে ব্যস্ত থাকায় আমাদের ওপর দায়িত্ব এবং চাপ দুটোই এখন অনেক বেশি । দর্শক এখন আর সস্তা কমেডি দেখতে চান না, তারা গল্প খোঁজেন। আমরা আমাদের শতভাগ দিয়ে চেষ্টা করেছি বৈচিত্র্যময় কাজ উপহার দিতে।’ আলোচিত মুখ সাদিয়া আয়মান বলেন, ‘লিড ক্যারেক্টারে কাজ করাটা যে কোনো নতুন শিল্পীর জন্য একইসঙ্গে আনন্দের এবং চ্যালেঞ্জের। সিনিয়রদের অনুপস্থিতিকে আমি নেতিবাচকভাবে দেখি না, বরং এটা আমাদের মতো নতুনদের জন্য নিজেদের প্রমাণ করার একটা বড় সুযোগ। তবে দর্শকরা যেন নতুনদের কাজে উৎসাহিত করেন এবং নাটক বা ওটিটি-সব জায়গাতেই যেন আমাদের কাজ দেখে মূল্যায়ন করা হয়, সেই অনুরোধ থাকবে।’

জীবনমুখী ও রোমান্টিক ঘরানার নাটকে প্রশংসা কুড়ানো তরুণ অভিনেতা খাইরুল বাসার বলেন, ‘সিন্ডিকেট বা গ্রুপিংয়ের কথা অনেকেই বলেন, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি ভালো কাজ এবং সততা থাকলে দর্শক ঠিকই গ্রহণ করবে। ওটিটির বড় প্রজেক্টগুলোতেও এখন নতুনদের একটু একটু করে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে কাস্টিংয়ে যেন ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের ফলোয়ার সংখ্যার চেয়ে অভিনয়ের যোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়, সেটাই ইন্ডাস্ট্রির কাছে আমাদের প্রত্যাশা।’

তবে পুরোনোদের পর্দা বদলে নতুনদের কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত হলেও সুযোগ পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকেই। এ প্রজন্মের অনেক তারকাই মনে করছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। মেধার চেয়ে ভিউ ও ফলোয়ারকে যেমন প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে তেমনি সিন্ডিকেট শব্দ থেকে বের হতে পারেনি ইন্ডাস্ট্রি। এ প্রসঙ্গে অভিনেতা মোশাররফ করিম মেধার সংকটের গভীরতা নিয়ে বলেন, ‘ভিউ বা ট্রাফিকের পেছনে অন্ধের মতো ছুটতে গিয়ে আমরা এক ধরনের সস্তা বিনোদন সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছি। বাজারের ডিমান্ড থাকবে, কিন্তু মেধার চর্চা যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে আগামী ১০ বছর পর ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনয় করার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী বলেন, ‘বাজারের চাহিদার অজুহাত দিয়ে প্রায়ই গল্প এবং চরিত্রের সঙ্গে আপস করা হয়। একটা সময় ছিল যখন স্ক্রিপ্ট দেখে কাজ হতো, এখন ডিরেক্টর বা প্রযোজকেরা ভাবেন কোন জুটিকে নিলে ইউটিউবে দ্রুত ১০ মিলিয়ন ভিউ আসবে বা ওটিটিতে সাবস্ক্রিপশন বাড়বে। তার সঙ্গে পুরোনো সিন্ডিকেড বনাম মেধার যুদ্ধ যে শেষ হয়েছে তা কিন্তু নয়। মেধার সঠিক মূল্যায়ন না করে কেবল চটকদার বিজ্ঞাপনী চাহিদার পেছনে ছুটলে সাময়িক লাভ হতে পারে, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়বে।’

এ প্রজন্মের অন্যতম আলোচিত নতুন মুখ তটিনী নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ‘পুরোনোরা পর্দা পাল্টানোয় নতুনদের সুযোগ তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাজারটা আরও কঠিন হয়েছে। কারণ নতুনদের মেধা প্রমাণের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়ার আগেই অবলীলায় বলে দেওয়া হয়, ওদের তো এখনো সেই বাজার দর তৈরি হয়নি। যদি নতুনদের বড় ক্যানভাসে কাজই করতে না দেওয়া হয়, তবে তাদের স্টার ভ্যালু তৈরি হবে কীভাবে? করপোরেট চাহিদা মেটাতে গিয়ে নির্মাতারা মেধার চেয়ে লবিং ও চেনা মুখকেই বারবার প্রাধান্য দিচ্ছেন। যদিও এই প্রতিবন্ধকতা আমাকে ততটা মোকাবিলা করতে হয়নি বা হচ্ছে না। তবে অনেকেই এমন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।’ অভিনেতা মুশফিক আর ফারহান বলেন, ‘এখন অনেক প্রজেক্টে কাস্টিং করার সময় চরিত্রের গভীরতা বোঝার চেয়ে দেখা হয় কার ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে ফলোয়ার বেশি। একজন জাত অভিনেতা বছরের পর বছর সাধনা করেও যে চরিত্রটি পাচ্ছেন না, একজন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার শুধু ভাইরালের জোরে সেই মেগা প্রজেক্টের লিড ক্যারেক্টার হয়ে যাচ্ছেন। বাজারের এই সস্তা চাহিদা মেধাবী শিল্পীদের ভেতর থেকে কাজের স্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া অনেকেই বলছেন, ইন্ডাস্ট্রিতে সিন্ডিকেট শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আদৌ কতটুকু শেষ হয়েছে সেটা কেউ বলছেন না।’

বোদ্ধাদের মতে, সময়ের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্র যেমন বেড়েছে তেমনি সিনিয়র শিল্পীদের পর্দা বদলে নতুনদের নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু তাদের মেধার যথাযথ মূল্যালয় না করতে পারলে ইন্ডাস্ট্রি সমৃদ্ধ হবে না। তাছাড়া স্টারডম বা ভিউ দেখে কাস্ট করার রীতির বদল যেমন দরকার তেমনি সিন্ডিকেট শব্দটিকে পুরোপুরি মুছে না ফেলতে পারলে দিনশেষে ইন্ডাস্ট্রির লাভের চেয়ে ক্ষতির দিকটাই বেশি হবে।