আমাদের দেশে স্কুলে শিশুদের বাংলা বর্ণমালার উচ্চারণ শেখানো হয়। কিন্তু শব্দে ব্যবহারের সময় ক্ষেত্রবিশেষে বর্ণের উচ্চারণ যে বদলে যায় এবং এ বদলে যাওয়া কেন, তা শেখানো হয় না। ফলে ছাত্রছাত্রীরা স্কুল থেকে বাংলা পড়াটা শেখে কিন্তু শব্দের সঠিক উচ্চারণরীতিটা শেখার সুযোগ পায় না। যে কারণে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের বিপাকে পড়তে হয়। একেকটি শব্দ একেকজন একেকভাবে উচ্চারণ করে। এতে ভাষার শৃঙ্খলা যেমন নষ্ট হয়, তেমনি সৌন্দর্যহানিও ঘটে।
স্কুল থেকে না শেখার কারণে অনেকে ব্যক্তিগত আগ্রহে আবৃত্তি প্রশিক্ষণ ক্লাসে ভর্তি হয়ে, অনেকে রেডিও-টেলিভিশনের উপস্থাপক ও সংবাদপাঠকদের উচ্চারণ শুনে এবং অনেকে উচ্চারণ অভিধান পড়ে ভাষার সঠিক উচ্চারণ শেখেন। কিন্তু যাঁদের সে সুযোগ থাকে না, তাঁরা একেকজন একেকভাবে বিভিন্ন শব্দের উচ্চারণ করেন। এতে ভাষার উচ্চারণে প্রত্যাশিত শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। অনেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পরও বাংলা উচ্চারণে তাঁদের বিরাট সমস্যা থেকে যায়। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা। অন্যান্য বিষয়ের মতো প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বয়স অনুযায়ী উচ্চারণরীতি শেখানো হলে ছাত্রছাত্রীরা উচ্চারণ বিষয়ে বিশদ ধারণা লাভ করতে সক্ষম হতো।
ধরা যাক ‘কবিতা’ শব্দটির কথা। শব্দটি ‘ক’ দিয়ে শুরু হলেও শুধু বর্ণটি উচ্চারণের সময় আমরা যেভাবে ‘ক-অ’ বলি, ‘কবিতা’ শব্দে এর উচ্চারণ কিন্তু ‘ক-অ’ নয়। বাংলা উচ্চারণের নিয়ম অনুযায়ী ‘কবিতা’ শব্দে এর সঠিক উচ্চারণ হলো ‘কো’। অর্থাৎ শব্দটির সঠিক উচ্চারণ ‘ক-অ বিতা’ নয়, শব্দটির সঠিক উচ্চারণ হলো ‘কোবিতা’। এখানে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে ‘কবিতা’ শব্দের উচ্চারণ ‘ক-অ বিতা’ না হয়ে ‘কোবিতা’ হবে কেন? আমাদের ভাষার উচ্চারণরীতিতে এর একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
বাংলা একাডেমি প্রণীত উচ্চারণ অভিধান অনুযায়ী নিয়মটি হলো, শব্দের আদিতে যদি ‘অ’ থাকে এবং তারপরে ই-কার, উ-কার থাকে তবে সে অ-এর উচ্চারণ সাধারণত ও-কারের মতো হয়। ‘কবিতা’ শব্দে লক্ষ করা যায়, ক-এর পরে ব-এর ওপর একটি হ্রস্ব-ই কার রয়েছে। এই হ্রস্ব-ই–এর কারণে ক-টা ‘ক-অ’ উচ্চারিত না হয়ে ‘কো’ উচ্চারিত হবে। ফলে ‘কবিতা’ শব্দটির সঠিক উচ্চারণ হবে ‘কোবিতা’।
বাংলা উচ্চারণরীতিতে এ সূত্রকে বলা হয় আদ্য-অ–এর সূত্র। এ সূত্র জানা থাকলে অসংখ্য শব্দের সঠিক উচ্চারণ জানা সহজ হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে—অভিমান, গতি, অনুকূল, মরু, বধূ, ময়ূখ, নদী ইত্যাদি শব্দের কথা। এ তালিকা অনেক দীর্ঘ। আলোচনা করার জন্য কয়েকটি শব্দ বেছে নেওয়া হলো যাতে ভিন্ন ভিন্ন শব্দে ‘অ’ কীভাবে ‘ও’ হিসেবে উচ্চারিত হয়, সে বিষয়ে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়।
লক্ষ করা যায়, ওপরে উল্লেখিত প্রতিটি শব্দের প্রথম বর্ণে ‘অ’ রয়েছে। অর্থাৎ অভিমান, গতি, অনুকূল, মরু, বধূ, ময়ূখ, নদী—সব কটি শব্দই শুরু হয়েছে ‘অ’ দিয়ে। যেমন অভিমানে ‘অ’, গতিতে ‘গ-অ’, অনুকূলে ‘অ’, মরুতে ‘ম-অ’, বধূতে ‘ব-অ’, ময়ূখে ‘ম-অ’ এবং নদীতে ‘ন-অ’। অভিমানে অ-এর পর হ্রস্ব-ই কার রয়েছে, গতিতেও তা–ই, অনুকূলে উ-কার, মরুতেও তা–ই, বধূতে দীর্ঘ উ-কার এবং নদীতে দীর্ঘ ই-কার। যে কারণে এসব শব্দের উচ্চারণ হবে যথাক্রমে— অভিমান নয় ওভিমান, গতি নয় গোতি, অনুকূলে নয় ওনুকূলে, মরু নয় মোরু, বধূ নয় বোধূ, ময়ূখ নয় মোয়ূখ এবং নদী নয় নোদী। আদ্য অ-এর মতো মধ্য-অ এবং অন্ত্য-অ–এর কারণেও শব্দের উচ্চারণ বদলে যায়। বাংলা উচ্চারণ অভিধানে এসব শব্দের তালিকা ও বিশদ বিবরণ রয়েছে। শৈশবে স্কুলে বর্ণমালা শেখানোর সময় এই উচ্চারণরীতি শেখানো হলে পরবর্তীকালে উচ্চারণ নিয়ে আর ঝামেলায় পড়ার ঝুঁকি থাকে না।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আদ্য–অ–এর পরে হ্রস্ব ই-কার, দীর্ঘ ই-কার, হ্রস্ব উ-কার এবং দীর্ঘ উ-কারের মতো আরেকটি নিয়ম হলো য-ফলার ব্যবহার। য-ফলার কারণেও শব্দের উচ্চারণ বদলে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ‘অধ্যাপক’ শব্দটির কথা। আমরা লিখি অধ্যাপক, কিন্তু বলার সময় যাঁরা সচেতন, তাঁরা বলেন ‘ওধ্যাপক’। আর যাঁরা সচেতন নন, তাঁরা বলেন ‘অ’ধ্যাপক। প্রশ্ন হলো, ‘অধ্যাপক’ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সময় কেন ‘ওধ্যাপক’ হবে? এর কারণ, বাংলা উচ্চারণরীতি অনুযায়ী শব্দের আদ্য ‘অ’-এর পরে য-ফলা (্য') যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ থাকলে ‘অ’-এর উচ্চারণ সাধারণত ও-কারের মতো হয়। যেমন অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, অত্যন্ত, কল্যাণ, সত্য, তথ্য, গদ্য, পদ্য, অভ্যাগত, কন্যা, অত্যাচার ইত্যাদি।
এসব শব্দের উচ্চারণ হবে যথাক্রমে ‘অ’ধ্যাপক নয় ওধ্যাপক, ‘অ’ধ্যক্ষ নয় ওধ্যক্ষ, ‘অ’ত্যন্ত নয় ওততোনতো, ‘ক’ল্যাণ নয় কোলল্যান, ‘স’ত্য নয় শোততো, ‘ত’থ্য নয় তোথথো, ‘গ’দ্য নয় গোদদো, ‘প’দ্য নয় পোদদো, ‘অ’ভ্যাগত নয় ওবভাগতো, ‘ক’ন্যা নয় কোননা, ‘অ’ত্যাচার নয় ওততাচার। এই নিয়মের আওতাধীন শব্দের তালিকাও অনেক দীর্ঘ।
য-ফলার মতো র-ফলার কারণেও শব্দের উচ্চারণ বদলে যায়। যেমন প্রধানমন্ত্রী, প্রকাশ, প্রণাম, প্রতিজ্ঞা, গ্রন্থ, ব্রত, ক্রম ইত্যাদি। দেখা যাচ্ছে এসব শব্দের শুরুতে কোথাও প্র আছে, কোথাও গ্র আছে, কোথাও ব্র আছে, আবার কোথাও ক্র আছে। ফলে অনেকেই উচ্চারণ করেন ‘প্র’ধানমন্ত্রী, ‘প্র’কাশ, ‘প্র’ণাম, ‘প্র’তিজ্ঞা, ‘গ্র’ন্থ, ‘ব্র’ত, ‘ক্র’ম। কিন্তু উচ্চারণরীতি অনুযায়ী এসব শব্দের সঠিক উচ্চারণ হবে যথাক্রমে— প্রধানমন্ত্রী নয় প্রোধানমন্ত্রী, প্রকাশ নয় প্রোকাশ, প্রতিজ্ঞা নয় প্রোতিজ্ঞা, গ্রন্থ নয় গ্রোনথো, ব্রত নয় ব্রোতো, ক্রম নয় ক্রোম। আর এই উচ্চারণের সূত্রটি হলো শব্দের শুরুর বর্ণের সঙ্গে র-ফলা যুক্ত থাকলে তার উচ্চারণ ও-কারান্ত হয়। ওপরের সব কটি শব্দের শুরুর বর্ণের সঙ্গে র-ফলা যুক্ত রয়েছে। যে কারণে বর্ণগুলোর উচ্চারণ ও-কারান্ত হয়ে প্রো, গ্রো, ব্রো, ক্রো হয়ে গেছে।
সম্পূর্ণ উচ্চারণরীতি তুলে ধরা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। যে বিষয়ে আলোকপাত করা এ লেখার মূল্য উদ্দেশ্য, তা হলো শৈশবে ছাত্রাবস্থায় স্কুলে বর্ণমালা শেখানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা।
স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে, কিন্তু জাতীয় জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয় থেকে গেছে অবহেলিত। অথচ ভাষায় শৃঙ্খলা রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে শিক্ষাক্রমে বাংলা উচ্চারণরীতি অন্তর্ভুক্ত করা দরকার ছিল সর্বাগ্রে।
প্রাথমিক পর্যায় থেকে ক্রমান্বয়ে উচ্চতর ক্লাসের পাঠ্যপুস্তকে উচ্চারণরীতি অন্তর্ভুক্ত করা হলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম উপকৃত হবে। তারা স্কুলে অধ্যয়নকালে বাংলা উচ্চারণরীতির নিয়মকানুন রপ্ত করে মাতৃভাষাটা শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে শিখবে। এতে একদিকে যেমন আমাদের প্রিয় মাতৃভাষার উচ্চারণে শৃঙ্খলা রক্ষিত হবে, অন্যদিকে উচ্চারণে শৃঙ্খলার মাধ্যমে কথ্যভাষার সৌন্দর্যও বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষিত জনগণের উচ্চারণ হয়ে উঠবে আরও শ্রুতিমধুর, আরও আকর্ষণীয়। আমাদের ভাষা হবে আরও ঐশ্বর্যমণ্ডিত।
এই উচ্চারণরীতি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে বিভিন্ন ক্লাসের শিক্ষার্থীদের জন্য এর পাঠ্যসূচি কী হবে, তা দেশের উচ্চারণবিশেষজ্ঞ ও খ্যাতিমান আবৃত্তিকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শও কাজে লাগানো যেতে পারে। আমাদের জাতীয় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন কমিটি ব্রিটেনে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীদের শব্দে ব্যবহৃত বর্ণমালার উচ্চারণ শেখানোর জন্য কীভাবে ফনিকস (phonics) শিক্ষা দেওয়া হয়, সে পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক








