সরকারি স্কুলে ‘মিড ডে মিল’ বা শিশুদের জন্য নির্ধারিত দুপুরের খাবারে ডিমের বদলে নিরামিষ যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু স্কুলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর শিশুদের জন্য এই খাবার তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসকনকে। এ নিয়ে দেশটিতে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমেও বেশ লেখালেখি হচ্ছে।
এই প্রকল্পের অধীনে সরকারি ও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলগুলোর শিশুদের বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়া হয়। দেশটির লাখ লাখ সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জন্য এটিই সারা দিনের সবচেয়ে পুষ্টিকর খাবার। আবার অনেক শিশুর বেলায় এটাই সারাদিনের একমাত্র খাবার। এই কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের পুষ্টির উন্নয়ন, ক্ষুধা নিবারণ এবং স্কুলে ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখে আসছে।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচিত ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার ঘোষণা দেয়, কলকাতা পৌরসভা পরিচালিত স্কুলগুলোর দুপুরের খাবার তৈরির দায়িত্ব ‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস’ (ইসকন)-এর হাতে তুলে দেওয়া হবে। ইসকন মূলত ‘হরে কৃষ্ণ’ আন্দোলন নামে পরিচিত একটি হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন।
গত সপ্তাহে ইসকনের একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’ এই খাবারগুলো তৈরি করবে। এই ফাউন্ডেশন কেবল নিরামিষ খাবার সরবরাহ করে থাকে। ফলে তারা ডিমের পরিবর্তে প্রোটিনের অন্য উৎস যুক্ত করবে।
বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রকল্পটি এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি এবং এটি অন্য স্কুলগুলোতেও সম্প্রসারিত হবে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। ইসকন বিবিসিকে জানিয়েছে, এই বিষয়ে এখনো আলোচনা চলছে এবং চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
তবে এই সিদ্ধান্ত ভারতজুড়ে পুরোনো এক বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে, তা হলো-স্কুলের দুপুরের খাবারের পাতে আসলে কী থাকা উচিত?
পুষ্টিবিদ ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য ডিম হচ্ছে সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকর প্রোটিনের উৎস। এর আগেও বেশ কয়েকটি রাজ্যের সরকার (যাদের অনেকেই বিজেপি নেতৃত্বাধীন) স্কুলের খাবারে ডিমের ব্যবহার বন্ধ বা সীমিত করার চেষ্টা করলে বারবার বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, খাবার থেকে ডিম বাদ দিয়ে সরকার পুষ্টি নীতিতে ধর্মীয় বা আদর্শিক বিশ্বাস চাপিয়ে দিচ্ছে। তবে এই সিদ্ধান্তের সমর্থকদের দাবি, সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা করা নিরামিষ খাবার থেকেও একই ধরনের পুষ্টি উপাদান পাওয়া সম্ভব।
গত মে মাস পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকা প্রধান বিরোধী দল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে স্কুলশিক্ষার্থীদের ওপর ‘নিরামিষ আহার চাপিয়ে দেওয়ার’ চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছে।
অন্যরা বলছেন, ইসকন কর্মকর্তার প্রস্তাবিত সয়াবিন বা রাজমার (একধরনের শিম বিচি) মতো বিকল্পগুলো এই রাজ্যে ব্যাপকভাবে খাওয়া হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা এটি সহজে গ্রহণ নাও করতে পারে।
কিছু রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী অবশ্য একটি মধ্যপন্থা প্রস্তাব করেছেন। তাঁরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ডিম অথবা নিরামিষ বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।
উচ্চমানের প্রোটিনের সবচেয়ে সস্তা ও সহজলভ্য উৎস হিসেবে ডিম দীর্ঘকাল ধরেই স্বীকৃত। সাধারণত প্রতিটি ডিমের দাম প্রায় আট রুপি এবং এটি বহু প্রজন্ম ধরে বাংলার খাদ্য সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের ‘ভালো ও পবিত্র খাবার’ দেওয়া।
এই পদক্ষেপের পেছনে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী আদর্শ কাজ করছে—এমন সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ‘আপনাদের “হরে কৃষ্ণ” বলতে হবে না। কেউ আপনাকে জোর করবে না।’
ইসকন বলছে, এই সমালোচনা অমূলক। তাদের প্রতিষ্ঠিত ‘অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে তারা কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাট ও দিল্লির একাংশসহ ভারতের ১৬টি রাজ্যের প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থীকে স্কুলের খাবার সরবরাহ করে থাকে।
গত সপ্তাহ পর্যন্ত ইসকনের কলকাতা শাখার সহসভাপতি পদে থাকা রাধারমণ দাস স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, তাঁদের তৈরি খাবার যেন পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত হয়, সে বিষয়ে সংস্থাটি বিশেষ যত্ন নেয়। তাদের নিরামিষ মেন্যুতে ডিমের পুষ্টিগুণের সমপরিমাণ প্রোটিন ও ভিটামিন নিশ্চিত করা হবে বলেও দাবি করেন তিনি।
অবশ্য এরপর রাধারমণ দাসকে তাঁর সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও ইসকন প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের কোনো কারণ ব্যাখ্যা করেনি।
এ বিষয়ে আরও মন্তব্যের জন্য বিবিসি ইস্কনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
১৯২৫ সালে মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই) শুরু হওয়া একটি স্কুল ফিডিং কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে ১৯৯৫ সালে দেশব্যাপী এই প্রকল্প চালু করা হয়। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম কর্মসূচি, যার আওতায় ১১ কোটিরও বেশি শিশুকে খাবার দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় সরকার ক্যালরি ও প্রোটিনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিলেও রাজ্যগুলো ঠিক করে তারা কীভাবে সেই চাহিদা পূরণ করবে। ফলে পুরো দেশে একক কোনো মেন্যু নেই এবং রাজ্যভেদে খাবারে ভিন্নতা দেখা যায়।
যেমন বিহারে শিশুদের সাধারণত ডাল বা ছোলার সঙ্গে ভাত দেওয়া হয় এবং সপ্তাহে একদিন ডিম দেওয়া হয়। তামিলনাড়ুতে দুপুরের খাবারে প্রায়ই থাকে ভাত, সাম্বার (ডাল ও সবজির তরকারি), সবজি ও ডিম। অন্যান্য কিছু রাজ্য আবার কেবল নিরামিষ খাবার সরবরাহ করে। গুজরাট, উত্তর প্রদেশ ও দিল্লিতে মেন্যুতে সাধারণত ডাল ও সবজির সঙ্গে ভাত বা গমজাতীয় খাবার থাকে; কোনো কোনো সময় এর সঙ্গে দুধ, পনির বা ফল দেওয়া হয়।
খাবার তৈরির পদ্ধতিতেও ভিন্নতা রয়েছে। অনেক সরকারি স্কুলে নিজস্ব কর্মীরা স্কুলেই খাবার রান্না করেন। আবার অন্য জায়গায় রাজ্য সরকারগুলো পুষ্টির মানদণ্ড ও নির্ধারিত মেন্যু অনুযায়ী খাবার তৈরি ও বিতরণের জন্য বিভিন্ন অলাভজনক সংস্থাকে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব দিয়ে থাকে।
কলকাতার সরকারি স্কুলগুলোতে প্রায় এক দশক ধরে সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিনে ভাত, ডাল ও সবজির পাশাপাশি একটি করে ডিম দেওয়া হতো।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিবিসিকে জানিয়েছে, তারা এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছে, কারণ প্রতিদিন একই খাবার খাওয়ার চেয়ে এটি একটি নতুনত্ব আনবে। তবে অনেকে হতাশ হয়ে বলেছে, তারা ডিম দেওয়ার দিনগুলোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত।
চৈতালি মিত্র (৩৭) নামের এক অভিভাবক বলেন, স্কুলের খাবারে ডিম থাকাটাই ভালো। তিনি আরও যোগ করেন, ‘ডিম থাকলে আমি নিশ্চিন্ত থাকতাম যে আমার মেয়ের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হচ্ছে।’
এদিকে পুষ্টিবিদরা এই বিতর্কের চেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন নিরামিষে কি ডিমের মতো পুষ্টি মিলবে কি না সে বিষয়ে। নয়াদিল্লির স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালের পুষ্টিবিদ ফারেহা শানাম বলেন, ডিম হচ্ছে প্রোটিনের অন্যতম সম্পূর্ণ ও সাশ্রয়ী উৎস। ডিমে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় নয়টি জরুরি অ্যামিনো অ্যাসিডই রয়েছে। ডাল পুষ্টিকর হলেও এতে ফাইবারের পরিমাণ বেশি এবং এতে অপ্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিডের ভাগ বেশি থাকে।
তিনি আরও বলেন, ‘ডিমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি এবং বি১২ থাকে, যা বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য পুষ্টির একটি কার্যকর উৎস।’
ডক্টর শানামের মতে, পনিরের মতো খাবার একই ধরনের পুষ্টি দিতে পারে, তবে সেগুলো ডিমের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল। ফলে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত কোনো কর্মসূচিতে নিয়মিত পনির দেওয়া কঠিন।
হায়দরাবাদের গ্লেনিগেলস অ্যাওয়ার হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডক্টর ভামশি ভি বলেন, ‘অনেক শিশুর জন্য স্কুলের এই খাবারটিই সারা দিনের সবচেয়ে পুষ্টিকর খাবার।’
ডক্টর ভামশি সতর্ক করে বলেন, পুষ্টির সঠিক ভারসাম্য না মিলিয়ে ডিম বাদ দিলে শিশুরা প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের (অণুপুষ্টি) ঘাটতিতে পড়তে পারে। এর প্রভাব হয়তো সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যাবে না, তবে দীর্ঘ মেয়াদে এটি শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, শেখার ক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
দেশের সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষকদের কাছে মূল বিষয়টি একেবারেই সহজ ও বাস্তব। সুবিধাবঞ্চিত বহু শিশুর জন্য এই খাবার অপরিহার্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিল্লির এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির অন্যতম প্রধান কারণ এই মিড-ডে মিল।’
তিনি আরও জানান, অনেক শিশুই ক্ষুধার্ত অবস্থায় স্কুলে আসে এবং প্রতিদিন দুপুরের খাবারের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।
এদিকে বিহারের এক শিক্ষক মনে করেন, খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগটি শিশুদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত, যেমনটি তাঁর স্কুলেই করা হয়। সেখানে প্রতি শুক্রবার শিক্ষার্থীদের ডিম দেওয়া হয়, আর যাঁরা ডিম খান না, তাঁরা বিকল্প হিসেবে পান কলা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শিক্ষক বলেন, ‘কাউকেই একটি খেতে বা অন্যটি বাদ দিতে বাধ্য করা হয় না।’








