দেশীয় মোবাইল উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে গিয়ে স্মার্টফোনের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হলে দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বেসিসের সাবেক সভাপতি ও টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের (টিআইপিএপি) আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর।

তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক মানুষের জন্য স্মার্টফোনই প্রধান কম্পিউটিং ডিভাইস। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ক্লাউডভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে স্মার্টফোন দিয়েই এখন অফিসের কাজ, ডকুমেন্ট তৈরি থেকে শুরু করে নানা ধরনের উৎপাদনশীল কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। তাই স্মার্টফোনের দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।

বুধবার (১ জুলাই) রাজধানীর কারওয়ানবাজারের বিডিবিএল ভবনে টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম (টিআইপিএপি) আয়োজিত ‘টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতে বাজেটের প্রভাব' শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন তিনি।

এতে আরও বক্তব্য বক্তব্য দেন টেলিকম বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, বেসিসের সাবেক পরিচালিক ও ড্রিম ৭১ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদ কবির, শেয়ার ট্রিপের সিইও সাদিয়া হক। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন বেসিসের সাবেক পরিচালক ও বন্ডস্টাইন টেকনোলজি লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মীর শাহরুখ ইসলাম।

ফাহিম মাশরুর বলেন, বর্তমানে তরুণদের বড় একটি অংশ স্মার্টফোনকেই তাদের প্রাথমিক ডিভাইস হিসেবে ব্যবহার করছে। একসময় যেসব কাজ ল্যাপটপে করতে হতো, এখন তার অনেক কিছুই স্মার্টফোনে করা যায়। ফলে ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন-দুই ধরনের ডিভাইসের দামই বাড়লে সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।

তিনি বলেন, সরকার স্থানীয়ভাবে স্মার্টফোন উৎপাদন বাড়াতে চায়, এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু সুরক্ষামূলক নীতি (প্রোটেকশন) দিয়ে একটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখার কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তার ভাষ্য, দেশে অধিকাংশ স্মার্টফোন কারখানায় মূলত বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ এনে সংযোজন করা হয়। স্থানীয় মূল্য সংযোজন তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে এই শিল্পে কর্মসংস্থানও সীমিত। অন্যদিকে দেশের বাজারে স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর বাজার অংশও আগের তুলনায় কমেছে এবং বর্তমানে বেশিরভাগ উৎপাদনই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর।

তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট শিল্পকে সুবিধা দিতে গিয়ে দেশের ১০ থেকে ১৫ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী কিংবা ভবিষ্যতের ক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। সরকার যখন ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ ও ডিভাইসের প্রাপ্যতা বাড়ানোর কথা বলছে, তখন স্মার্টফোনের দাম বাড়ার মতো নীতি সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

স্টার্ট-আপ খাত প্রসঙ্গে ফাহিম মাশরুর বলেন, বাজেটে স্টার্ট-আপের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও কর-সুবিধা ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে বাস্তবে এসব সুবিধা কতজন উদ্যোক্তা পাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি জানান, তার সর্বশেষ জানা তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) নিবন্ধিত স্টার্ট-আপের সংখ্যা এখনো ১০০-এরও কম। কেন অধিকাংশ স্টার্ট-আপ নিবন্ধন করছে না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ফাহিম মাশরুরের আশঙ্কা, যথাযথ যাচাই-বাছাই না হলে প্রকৃত স্টার্ট-আপের পরিবর্তে অন্য প্রতিষ্ঠান স্টার্ট-আপ পরিচয়ে নিবন্ধন করে কর-সুবিধার অপব্যবহার করতে পারে।

তিনি বলেন, অতীতেও আইটি ও সফটওয়্যার খাতে কর অব্যাহতির সুযোগ নিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান অন্য খাতের আয়কে সফটওয়্যার খাতের আয় হিসেবে দেখিয়ে সুবিধা নিয়েছে। ফলে যাদের জন্য নীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল, অনেক ক্ষেত্রে তারা বঞ্চিত হয়েছেন।

‘আমরা চাই স্টার্ট-আপের জন্য যে সুবিধাগুলো দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো যেন প্রকৃত এবং নতুন উদ্যোক্তারাই পান। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে।’

ইএইচটি/এমএএইচ/