কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর সমালোচিত হয় স্পেনের খেলা। কিন্তু সেই স্পেন উঠেছে বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে। তাদের ফর্ম প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ের কারণ। এবার বিশ্বকাপে স্পেন একমাত্র দল হিসেবে এখনো গোল হজম করেনি।

বিশ্বকাপে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় গোল না খাওয়ার রেকর্ডও স্পেনের। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে জাপানের বিপক্ষে গোল হজমের পর থেকে এ পর্যন্ত ৬০৯ মিনিট তাদের জালে কেউ বল পাঠাতে পারেনি।

লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে আজ বাংলাদেশ সময় রাতে কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম। এই ম্যাচটি নিয়ে সবচেয়ে বড় আলোচনা হলো, স্পেনের জালে গোল করতে পারবে তো রুডি গার্সিয়ার দল? তবে কেন গোল করা যাচ্ছে না, তার ব্যবচ্ছেদে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, নিজেদের বক্সে প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে কমসংখ্যকবার বল ছুঁতে দিয়েছে তারা।

সহজ কথায়, টুর্নামেন্টে টিকে থাকা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বলকে নিজেদের গোলপোস্ট থেকে দূরে রাখার কাজটি সবচেয়ে কার্যকরভাবে করে দেখাচ্ছে স্প্যানিশরা।

বল ধরে রেখে খেলার কৌশলটা কেমন, সেটা ম্যানচেস্টার সিটিতে ৯ বছর কাটিয়ে ভালোই জানা আছে আর্জেন্টিনার সাবেক রাইটব্যাক পাবলো জাবালেতার। আক্রমণে ওঠার সময় স্পেন যেভাবে নিজেদের রক্ষণ ধরে রাখে, জাবালেতা তাতে মুগ্ধ।

ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের অন্যতম সদস্য জাবালেতা বলেন, ‘অবশ্যই বল দখলে এগিয়ে থাকার মানে হলো ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন এবং প্রতিপক্ষকে বারবার আক্রমণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে পারবেন। বল পায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে স্প্যানিশরা ভীষণ পটু, এটা যেন তাদের ডিএনএতেই মিশে আছে।’

বেলজিয়ামের মুখোমুখি হওয়ার আগে অনুশীলনে স্পেনের খেলোয়াড়রা

জাবালেতা যোগ করেন, ‘তাদের খেলার মূল শক্তির আরেকটি জায়গা হলো পাস দেওয়ার সময় খেলোয়াড়েরা খুব কাছাকাছি অবস্থান করেন। ফলে বলের দখল হারালে খুব দ্রুত প্রতি–আক্রমণে উঠতে পারে। স্পেনে একদম ছোটবেলা থেকেই খেলোয়াড়দের কৌশলটি শেখানো হয়, যাতে বল হাতছাড়া হওয়ার পরের সেকেন্ডেই সবাই সচেতন থাকে এবং সঠিক পজিশনে থেকে দ্রুত বলটি কেড়ে নিতে পারে।’

সৌদি আরব ম্যাচের উদাহরণ দেওয়া যায়। বাঁ দিকে পেদ্রি, আলেক্স বায়েনা ও মার্ক কুকুরেয়া ‘ট্রায়াঙ্গল’ তৈরি করে আক্রমণ গড়ে তোলেন। পাসটি প্রতিপক্ষ কেটে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই দুই মিডফিল্ডার দ্রুত চাপ সৃষ্টি করেন। এতে তাড়াহুড়া করে বল বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হন মুসাব আল-জুয়াইর। দানি ওলমো যখন বলটি উদ্ধার করেন, তখন তাঁর চারপাশে আরও চার সতীর্থ পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে। এই কৌশলের কারণে স্পেন মাঠের আধিপত্য ধরে রাখতে পারে।

নকআউট পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের উদাহরণও দেওয়া যায়। লামিনে ইয়ামাল বক্সের ভেতর ট্যাকলের শিকার হন, বল নিয়ে অস্ট্রিয়া দ্রুত পাল্টা আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রদ্রি মার্সেল জাবিৎসারকে চেপে ধরে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বলের দখল ফিরে পান। তখনো স্প্যানিশ এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের চারপাশে চারজন সতীর্থ পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে। দলগত এ কৌশলে খেলোয়াড়দের মধ্যকার দূরত্ব সব সময় কম থাকে। এটি স্পেনকে যেমন দ্রুত বল কাড়তে সাহায্য করে, তেমনি মুহূর্তেই আক্রমণ তৈরি করতে পারে। এতে প্রতিপক্ষকে আক্রমণে ওঠার বদলে রক্ষণভাগ নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়।

স্পেন তারকা রদ্রি

জাবালেতা বলেন, ‘আমি স্পেনে খেলেছি, সেখানে থেকেছি। দেশটির প্রতিটি অঞ্চলেই ফুটবলের এই একই ব্যাকরণ শেখানো হয়। বল হারানোর পরের ওই দু-তিন সেকেন্ড যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে, তা তারা সবাই জানে।’

পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের রক্ষণসীমায় স্পেনের চেয়ে বেশি বল কাড়তে পারেনি আর কোনো দল। স্পেনের বিপক্ষে প্রতিপক্ষ দলগুলো গড়ে মাত্র ১৯.৩ সেকেন্ড বল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে, যা টুর্নামেন্টের অন্য যেকোনো দলের চেয়ে অনেক কম।

চুক্তি ছিঁড়ে ফেলে বলতাম, গোল্লায় যান—আনচেলত্তির ওপর ক্ষোভ উগরে দিলেন রোমারিও

ফিফা ফুটবল পারফরম্যান্স ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, মাঝমাঠে কুবারসি ও লাপোর্তে নিজেদের ৩১টি ডুয়েলের মধ্যে ২৪টিতেই (৭৭.৪ শতাংশ) জয়ী হয়েছেন। পেছনে বড় ফাঁকা জায়গার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সামনে এগিয়ে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা দুর্দান্ত।

স্পেন প্রায়ই প্রতিপক্ষকে মাঠের একটি নির্দিষ্ট প্রান্তে বল নিয়ে যেতে বাধ্য করে এবং এরপর সব খেলোয়াড়কে কড়া পাহারায় রেখে পাসের সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়। বলের দখল হারিয়ে স্পেন তাদের মোট সময়ের ১০.৪ শতাংশ ব্যয় করেছে ‘হাই ব্লক’ (মাঠে ওপরের দিকে প্রতিপক্ষকে ব্লক করা) কৌশলে। চলতি বিশ্বকাপে এই কাজে স্পেনের চেয়ে এগিয়ে নেই আর কোনো দেশ।

স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে

কৌশলে ঝুঁকি যে একেবারেই নেই, তা কিন্তু নয়। গতিময় ফরোয়ার্ডরা রক্ষণভাগের পেছনে ফাঁকা জায়গার ফায়দা তুলে নিতে পারেন দারুণভাবে। কিন্তু লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন যেন এক নিখুঁত ও সুগঠিত যন্ত্র। বল পায়ে তাদের খেলাটা বেশি চোখে পড়ে। তবে আসল কারিকুরিটা সম্ভবত বল ছাড়া তাদের মুভমেন্ট। ওই কাজে এখন পর্যন্ত নিখুঁত বলেই তো গোল হজম করেনি স্পেন।

পেনাল্টিতে এমবাপ্পে–নেইমারদের থমকে যাওয়া কৌশল কতটা কার্যকর