এক নারী শ্রমিকের মৃত্যু, এরপর প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদের ঢেউ কেন মূল কারখানায় সীমাবদ্ধ না থেকে দুই কিলোমিটার দূরের একের পর এক তৈরি পোশাক কারখানায় গিয়ে আঘাত হানল এই প্রশ্নটি এখন ঘুরপাক খাচ্ছে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলজুড়ে।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং শিল্প পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান মিলিয়ে সামনে আসছে একাধিক প্রশ্ন, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে- ঘটনাটি কেবল স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক বিক্ষোভ ছিল না, এর পেছনে থাকতে পারে কোনো চক্র।
আরো পড়ুন: গাজীপুরে পোশাক শ্রমিক মৃত্যু ঘিরে ফের উত্তেজনা, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার টেপিরবাড়ী এলাকায় অবস্থিত কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেড কারখানায় এক নারী শ্রমিকের মৃত্যুর পর সেখানে কর্মরত শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানান। শ্রমিকদের দাবি, তাদের আন্দোলনে কোনো ভাঙচুর বা সহিংসতা হয়নি। অথচ একই সময় রহস্যজনকভাবে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে মাওনা চৌরাস্তা ও কেওয়া এলাকায় অবস্থিত অন্তত পাঁচটি তৈরি পোশাক কারখানায় একযোগে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- শ্রীপুর পৌরসভার এমএইচসি অ্যাপারেলস লিমিটেড, পারটেক্স গ্রুপের ট্রিপল অ্যাপারেলস লিমিটেড, লিফ গ্রেড ক্যাজুয়েলওয়ার লিমিটেড, মাওনা চৌরাস্তার নোমান ইউভিং মিলস লিমিটেড এবং ইয়াসমিন স্পিনিং মিলস লিমিটেড।
আরো পড়ুন: গাজীপুরে ৫ পোশাক কারখানায় হামলা: তিন মামলায় আসামি ১,১০০
ঘটনার পর ভাইরাল হওয়া ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারীদের বড় একটি অংশ শিশু, কিশোর এবং হাফপ্যান্ট বা লুঙ্গি পরিহিত যুবক। তাদের অধিকাংশের গলায় কারখানার পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) ছিল না। এই দৃশ্য নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- এরা আদৌ শ্রমিক ছিলেন, নাকি পরিকল্পিতভাবে আনা বহিরাগত?
টেপিরবাড়ী এলাকার সাধারণ শ্রমিকদের সামনে ভিডিও ও ছবি দেখানো হলে তারা জানান, ভাঙচুরে অংশ নেওয়া কাউকেই তারা চেনেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেড কারখানার কয়েকজন শ্রমিক বলেন, তারা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। দুই কিলোমিটার দূরের কারখানাগুলোতে কারা গিয়ে ভাঙচুর করেছে সে সম্পর্কে তারা কিছু জানেন না। তাদের ধারণা, যারা হামলা সঙ্গে জড়িত তারা বহিরাগত।
আরো পড়ুন: শ্রীপুরে নারী শ্রমিকের মৃত্যু ঘিরে উত্তেজনা, সড়কে বিক্ষোভ
এমএইচসি অ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানার সামনের কয়েকজন দোকানদার জানান, হঠাৎ কয়েকশ অপরিচিত অল্প বয়সী তরুণ লাঠি নিয়ে এসে প্রথমে শ্রমিকবাহী দুটি বাসে হামলা চালায়। পরে কারখানার গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে শিপমেন্টের জন্য প্রস্তুত দুটি ট্রাক ও একটি প্রাইভেটকার ভাঙচুর করে।
ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাকচালক গিয়াস উদ্দিন বলেন, “অডিটের জন্য শিপমেন্টের গাড়ি লোড করা ছিল। ভাঙচুরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতির দায় কে নেবে?”
পারটেক্স গ্রুপের ট্রিপল অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ বিভাগ) শহিদুল ইসলাম বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজে হামলার আগে লুঙ্গি ও হাফপ্যান্ট পরা ব্যক্তিদের অবস্থান দেখা গেছে।”
তিনি বলেন, “এটি পূর্বপরিকল্পিত হামলা বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশকে দেওয়া হয়েছে এবং এ ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলা করা হয়েছে।”
শিল্প পুলিশ সূত্র জানায়, পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় ঘটনার শুরুতে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করা হয়নি। তবে, হামলার দিন দুপুর দেড়টার দিকে কেওয়া বাজার এলাকা থেকে প্রায় দেড় শতাধিক লোকের একটি মিছিল মাওনা চৌরাস্তায় গিয়ে নোমান ইউভিং মিলস লিমিটেড ও ইয়াসমিন স্পিনিং মিলস লিমিটেডে ভাঙচুর শুরু করলে পুলিশ কঠোর অবস্থান নেয়। পরে হামলাকারীরা দ্রুত সেখান থেকে সরে যায়।
শিল্প পুলিশের শ্রীপুর সাব জোনের ওসি আবদুল লতিফ বলেন, “সাধারণত এক কারখানার ঘটনার জেরে অন্য কারখানায় গিয়ে শ্রমিকরা হামলা চালায় না। মিছিলে অংশ নেওয়া অধিকাংশই ছিল শিশু, কিশোর ও অননুমোদিত যুবক। আমাদের ধারণা, নারী শ্রমিক ছুটি না পেয়ে মারা যাওয়ার মিথ্যা অজুহাত সামনে এনে একটি মহল আন্তর্জাতিক বায়ারদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং দেশের তৈরি পোশাক খাতকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে।”
শ্রীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহীনুর আলম বলেন, “ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, ছবি ও ভিডিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। হামলা ও ভাঙচুরে জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে।”
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ ইসলাম ভূঞা বলেন, “কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”








