স্টারলিংককে ‘আনফিল্টারড ডেটা’ সুবিধা দিয়েছে সরকার। খবরটি প্রকাশের পর অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, তাহলে কি এখন স্টারলিংকের গ্রাহকেরা কোনো ধরনের ওয়েবসাইট ব্লক ছাড়াই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন? এককথায় এর উত্তর হচ্ছে—না। এ সুবিধা বাংলাদেশের কোনো গ্রাহকের জন্য নয়। এমনকি বাংলাদেশে স্টারলিংকের গ্রাহকেরাও এর আওতায় পড়বেন না।
তাহলে সরকার ঠিক কিসের অনুমতি দিল? ‘আনফিল্টারড ডেটা’ই–বা কী? আর এতে বাংলাদেশের লাভটাই–বা কোথায়?
বিষয়টি বুঝতে হলে আগে জানতে হবে, এই অনুমতি আসলে কার জন্য এবং কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে।
‘আনফিল্টারড ডেটা’ আসলে কী
‘আনফিল্টারড ডেটা’ শুনে মনে হতে পারে, এটি কোনো বিশেষ ধরনের ইন্টারনেট। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। এখানে ‘আনফিল্টারড’ বলতে এমন আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিককে বোঝানো হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের জন্য নয়। তাই দেশের ভেতরে যেসব ওয়েবসাইট বা সেবার ওপর সরকারি ফিল্টারিং বা ব্লকিং ব্যবস্থা প্রযোজ্য, এই ট্রাফিক তার আওতায় পড়বে না।
সহজ একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায় বিষয়টি।
ধরুন, একটি ট্রাক ভারত থেকে বাংলাদেশ হয়ে নেপালে যাচ্ছে। ট্রাকটি বাংলাদেশের বাজারে কোনো পণ্য বিক্রি করছে না। শুধু বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য যে নিয়মগুলো প্রযোজ্য, সেগুলো ট্রানজিট পণ্যের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হয় না।
স্টারলিংকের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা এমন। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের ফাইবার অপটিক অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলোর গ্রাহকদের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক বহন করতে পারবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখানে ইন্টারনেটের ব্যবহারকারী নয়; বরং একটি ডিজিটাল ট্রানজিট করিডর হিসেবে কাজ করবে।
এ কারণেই একে ‘আনফিল্টারড ডেটা’ বলা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের কোনো গ্রাহকের জন্য উন্মুক্ত ইন্টারনেট নয়; বরং এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া আন্তর্জাতিক ডেটা ট্রাফিকের জন্য বিশেষ কারিগরিব্যবস্থা।
স্টারলিংক আসছে, দেশি ইন্টারনেট ব্যবসার কী হবেতাহলে ‘ফিল্টারিং’ কী
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথ দেশে প্রবেশ করার পর তা নির্দিষ্ট কারিগরি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। এর অংশ হিসেবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কিছু ওয়েবসাইট, অ্যাপ বা অনলাইন সেবায় প্রবেশ সীমিত করা যায়। অনেক সময় কোনো ওয়েবসাইট খুলতে গেলে সেগুলো দেখা যায় না। এর পেছনে এ ধরনের ব্যবস্থাই কাজ করে।
তবে ফিল্টারিং মানেই ব্যক্তিগত বার্তা বা চ্যাট পড়ে দেখা—বিষয়টি এমন নয়। এটা অনেকটা নির্দিষ্ট একটি সড়কের প্রবেশমুখ বন্ধ করে দেওয়ার মতো। কে কী কথা বলছে, তা না দেখে শুধু নির্দিষ্ট একটি গন্তব্যে যাওয়ার পথ বন্ধ করা হয়।
এ প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় সরকারি নির্দেশনা এলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। আর কারিগরি দিক থেকে ওয়েবসাইট বা সেবা ব্লক করার কাজটি পরিচালনা করে টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা।
তাহলে স্টারলিংকের নতুন অনুমতিতে এই ফিল্টারিং প্রযোজ্য হচ্ছে না কেন
কারণ, যে ডেটা বাংলাদেশ দিয়ে যাবে, তার গন্তব্য বাংলাদেশ নয়। এটি শুধু দেশের ভৌগোলিক অবকাঠামো ব্যবহার করে অন্য একটি দেশে পৌঁছাবে। তাই এটিকে দেশের অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট ট্রাফিকের মতো বিবেচনা করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশের লাভ কোথায়
এই পুরো আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ এর বিনিময়ে কী পাচ্ছে?
সরকার ও টেলিযোগাযোগ খাত–সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অনুমতির মূল উদ্দেশ্য স্টারলিংককে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়; বরং বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে একটি আঞ্চলিক ডেটা ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে তোলা।
সহজ করে বললে, একটি দেশ যেমন তার সড়ক, রেলপথ বা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে অন্য দেশের পণ্য পরিবহন করে আয় করতে পারে, তেমনি ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক বহনের মাধ্যমেও আয় করা সম্ভব। এই মডেলকে অনেকেই ‘ডিজিটাল ট্রানজিট করিডর’ বলে থাকেন।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্টারলিংক প্রথমে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানির (বিএসসিপিএলসি) কাছ থেকে এই সংযোগ নেবে। প্রয়োজন হলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক টেরেস্ট্রিয়াল কেব্ল (আইটিসি) অপারেটর—সামিট কমিউনিকেশনস বা ফাইবার অ্যাট হোম থেকেও একই ধরনের সংযোগ নিতে পারবে।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির প্রথম আলোকে বলেন, এই অনুমোদনের ফলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ডেটা কানেকটিভিটি হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় অপারেটরদের রপ্তানি আয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নেপাল ও ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলোকে নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে এ ধরনের সেবা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি দেশের বিদ্যমান ফাইবার অপটিক অবকাঠামোর ব্যবহারও বাড়বে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি সীমাবদ্ধতার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, স্টারলিংকের মতো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সংযোগ যদি বেসরকারি আইটিসি অপারেটরদের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাহলে তারা আগে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ আমদানি করবে, এরপর সেটিই স্টারলিংকের কাছে বিক্রি করবে। এতে দেশের নতুন করে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ সীমিত থাকবে। তাঁর মতে, এ ধরনের সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানির বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে দেশের অর্থনৈতিক লাভ তুলনামূলক বেশি হবে।
বাংলাদেশে স্টারলিংক আসার ১৫০তম দিন, কেমন চলছে ইন্টারনেট সেবাএটি কি একেবারেই নতুন
বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথ বা আইপি ট্রানজিট রপ্তানির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। তবে স্টারলিংকের ক্ষেত্রে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে; কারণ, এটি প্রথমবারের মতো একটি বৈশ্বিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবাদাতাকে এ ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি ভারতের বিএসএনএলকে সর্বোচ্চ ২০ জিবিপিএস পর্যন্ত আনফিল্টারড আইপি ট্রানজিট সেবা দিয়েছে। তবে সেই পরিসর ছিল তুলনামূলক ছোট এবং অনেকটাই পরীক্ষামূলক।
বিটিআরসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এটি অনেকটা দেশের অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথ সক্ষমতা কাজে লাগানোর মতো। আগেও একই ধরনের মডেলে অন্য দেশের কাছে এই সেবা দেওয়া হয়েছে। এখন আরও কয়েকটি দেশ এ ধরনের সংযোগ নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে।
দেশে স্টারলিংকের গ্রাহক কত
বাংলাদেশে স্টারলিংকের কার্যক্রম এখনো সীমিত পরিসরে। ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল লাইসেন্স পাওয়ার পর ৮ আগস্ট থেকে বাণিজ্যিক সেবা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছরের মাথায় দেশে স্টারলিংকের গ্রাহকসংখ্যা পাঁচ হাজারের কিছু বেশি। এর মধ্যে বেশির ভাগই করপোরেট গ্রাহক।
বাংলাদেশ থেকে স্টারলিংকের ইন্টারনেট যাবে প্রতিবেশী দেশেঝুঁকি আছে কি
‘আনফিল্টারড ডেটা’ শব্দটি শুনে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ কারণেই স্টারলিংকের আবেদন পাওয়ার পরপরই অনুমতি দেয়নি সরকার। বিটিআরসি সূত্র বলছে, কয়েক মাস ধরে কারিগরি পর্যালোচনা, একাধিক বৈঠক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মতামত নেওয়ার পর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ অনুমতির সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রথমত, এই সংযোগ কোনোভাবেই বাংলাদেশের গ্রাহকদের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিক বা পর্যটকেরাও এ সুবিধার আওতায় আসবেন না।
দ্বিতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট ট্রাফিক এবং বিদেশে যাওয়া ট্রানজিট ট্রাফিক সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে। এ জন্য স্টারলিংককে বিস্তারিত নেটওয়ার্ক ডায়াগ্রাম জমা দিতে হয়েছে।
তৃতীয়ত, প্রয়োজনে বিটিআরসি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যেন রিয়েল টাইমে এই ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ করতে পারে, সে ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী ‘ল-ফুল ইন্টারসেপশন’ (আইনানুগ আড়ি পাতা) বা আইনসম্মত নজরদারির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জানতে চাইলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, এই আনফিল্টারড ব্যান্ডউইডথ বাংলাদেশের ভেতরে সরবরাহ করা হবে না। এটি সরাসরি অন্য দেশগুলোয় চলে যাবে। দেশের অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট ট্রাফিক এবং বিদেশি ট্রানজিট ট্রাফিক প্রযুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হবে।








