জাতীয় নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এখন নতুন নির্বাচনি হাওয়া বইতে শুরু করেছে। শুক্রবার যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের সব দলের চোখ এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে। যদিও দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত নয়, তা হলেও সম্ভাব্য রোডম্যাপ অনুযায়ী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তফসিল ঘোষণা হতে পারে, এমন ধারণা থেকে ভেতরে ভেতরে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিটি রাজনৈতিক দল। বলা বাহুল্য, দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসানের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা নির্বাচিত সরকারের জন্য এটি তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক পরীক্ষাও বটে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি, বৈপ্লবিক ধারার তরুণদের দল এনসিপি এবং সুসংগঠিত জামায়াতে ইসলামী মাঠপর্যায়ে নির্বাচনের জোর প্রস্তুতিও নিচ্ছে। তবে প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো দলগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক স্থবিরতার চিত্র আমাদের কিছুটা হলেও চিন্তায় ফেলছে।
জানা গেছে, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠানের একটি চমৎকার নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করেছে, যা সময়ের নিরিখে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে আইনগতভাবে দলীয় প্রতীক না থাকলেও ভেতরে ভেতরে প্রতিটি দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তোড়জোড় এবং ঢাকা দক্ষিণের মতো স্পর্শকাতর আসনে জামায়াত ও এনসিপির তরুণ প্রার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন মাঠপর্যায়ে এক ধরনের নীরব অস্থিরতা তৈরি করছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, নির্বাচন না দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় সরকারদলীয় প্রশাসকদের বসিয়ে রাখায় রাজনৈতিক অংশীজনদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, স্থানীয় সরকারের মূল সৌন্দর্যই হলো জনগণের সরাসরি জবাবদিহিতা, যা প্রশাসক প্রথার মাধ্যমে সম্ভব নয়।
আমরা মনে করি, আসন্ন এই নির্বাচনি কর্মযজ্ঞ সামনে রেখে জনগণের কল্যাণে নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত একটি সুনির্দিষ্ট, সংবেদনশীল ও মানবিক রোডম্যাপ নিয়ে অবিলম্বে মাঠে নামা। স্বল্পমেয়াদে, আসন্ন বর্ষা মৌসুমের পরপরই নির্বাচন কমিশনকে আরপিও সংশোধনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ও সুনির্দিষ্ট তফসিল ঘোষণা করতে হবে। একইসঙ্গে নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা প্রশাসকরা যেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে নাগরিক সেবা সচল রাখেন, তা কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন। আর মধ্যমেয়াদে, নির্বাচনে সহিংসতা ও পেশিশক্তির ব্যবহার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে শতভাগ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে মাঠপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেন ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসতে পারেন। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার আইনি ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে, যাতে তারা বাজেট প্রাপ্যতার ভিত্তিতে নিজ নিজ এলাকার নাগরিক সংকটের প্রকৃত সমাধান করতে পারে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই নির্বাচিত সরকার বিগত আমলের সব ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের কলঙ্ক মুছে ফেলে দ্রুততম সময়ে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট উৎসব জাতিকে উপহার দেবে এবং মফস্বলের বঞ্চিত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি আরও মজবুত করবে-এটাই প্রত্যাশা।








