ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধুর ব্যাপক চাহিদা থাকলেও প্রতিবছর এর আহরণ উদ্বেগজনক হারে কমছে। সুন্দরবনের বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জ থেকে ২০২১ সালে মধু আহরিত হয়েছিল ১০৪ দশমিক ৪ টন, কিন্তু এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৩ টনে। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে ৮৭ শতাংশ আহরণ কমেছে প্রাকৃতিক এই মধুর।
মৌয়াল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মধু আহরণ উদ্বেগজনক হারে কমে যাওয়ার নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো সুন্দরবনে বনদস্যুদের পুনরুত্থান। দস্যুদের ভয়, বেপরোয়া চাঁদাবাজি, অপহরণ ও মুক্তিপণের আতঙ্কে এবার অনেক মৌয়াল বনেই প্রবেশ করেননি। যাঁরা জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদেরও অনেককে মাঝপথে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে।
এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে খলিশা, গরান, গেওয়া, কেওড়া, বাইনসহ মধুর প্রধান উৎস গাছগুলোতে এবার পর্যাপ্ত ফুল আসেনি। ফলে বনাঞ্চলে মৌচাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এ ছাড়া অভয়ারণ্যের সীমানা বৃদ্ধি এবং মধু আহরণের সময়সীমা তিন মাসের পরিবর্তে দুই মাসে নামিয়ে আনায় মৌয়ালদের প্রবেশযোগ্য এলাকাও অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বন বিভাগের পরিসংখ্যান থেকে মধু আহরণে এই ধসের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবছর ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সুন্দরবনে মধু আহরণের মৌসুম চলে। বনের শরণখোলা রেঞ্জের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০২১ সালে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জে মধু আহরিত হয়েছিল ১০৪ দশমিক ৪ টন, ২০২২ সালে ১০৫ টন, ২০২৩ সালে ৯৫ টন, ২০২৪ সালে ১০০ টন এবং ২০২৫ সালে ৬৪ দশমিক ৭ টন। অথচ এবার শরণখোলা রেঞ্জে মৌয়ালেরা মাত্র ১৩ দশমিক ৩ টন মধু আহরণ করতে পেরেছেন। আর শরণখোলা ও চাঁদপাই মিলে পূর্ব সুন্দরবনের রেঞ্জে সংগ্রহ হয়েছে ৪২ দশমিক ১ টন মধু।
শুধু মধু আহরণ কমেছে তা নয়, এ বছর সুন্দরবনে মৌয়াল প্রবেশও কমেছে। ২০২৫ সালে যেখানে ২ হাজার ২৫০ জন মৌয়াল বনে গিয়েছিলেন, সেখানে এবার গেছেন ১ হাজার ৪৫৩ জন।
বনদস্যুদের দৌরাত্ম্যের ভয়াবহতা উঠে এসেছে শরণখোলা উপজেলার উত্তর তাফালবাড়ী গ্রামের মৌয়াল ছগির হাওলাদার কথায়। ১১ সদস্যের একটি দল নিয়ে তিনি বনে মধু সংগ্রহে গিয়েছিলেন। কিন্তু মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে বনদস্যু ‘মেজো জাহাঙ্গীর বাহিনী’ তাঁদের নৌকায় অতর্কিত হামলা চালিয়ে দুই মৌয়ালকে অপহরণ করে এবং তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। শেষ পর্যন্ত দেড় লাখ টাকা দিয়ে তাঁদের মুক্ত করা হয়। ভয়ে দলের অপর সদস্যরা বাড়িতে ফিরে যান। তিনি এবং আরেকজন ঝুঁকি নিয়ে বনে থেকে গিয়েছিলেন।
ছগির হাওলাদার বলেন, ‘বনে অবস্থানকালে আমরা মাত্র দুই মণ মধু আহরণ করতে পেরেছি। বনে যাওয়া, অবস্থান এবং ফিরে আসা পর্যন্ত আমাদের সব মিলিয়ে অন্তত আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিমণ মধু আহরণ করতে না পারায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে।’
এদিকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধুর আহরণ কমে যাওয়ার বিপরীতে ব্যাপক চাহিদার সুযোগ নিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। তাঁরা প্রকারভেদে প্রতি কেজি মধুর দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকে ভেজাল মধু বিক্রি করছেন।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, এ বছর দস্যুদের অব্যাহত চাঁদাবাজি, অপহরণ ও নির্যাতনের কারণে গভীর বনের যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি মধু পাওয়া যায়, সেখানে এবার অনেক মৌয়াল যেতেই পারেননি। চাঁদা দিতে গিয়ে অনেকেই পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। মূলত বনদস্যুদের পুনরুত্থানই চলতি মৌসুমে মধু কম আহরণের প্রধান কারণ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নূর আলম শেখ বলেন, বনদস্যু দমন, মৌয়ালদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মধু আহরণের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এই খাত আরও বড় সংকটে পড়বে। জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধুর ঐতিহ্য ও বাজার ধরে রাখতে হলে জলবায়ু সহনশীল বন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পাশাপাশি বাজারে ভেজালরোধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।








