বর্ষাকালে রিমঝিম বৃষ্টি যেমন স্বস্তি আনে, তেমনি একটানা ভারী বর্ষণ আর জলাবদ্ধতা ডেকে আনে নানা রোগবালাই। বিশেষ করে টানা বৃষ্টির কারণে আমাদের চারপাশে পানি জমে এডিস ও অ্যানোফিলিস মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে, আবার সুপেয় পানির উৎসগুলোও দূষিত হয়ে পড়ে।

ফলে ঘরে ঘরে দেখা দেয় জ্বর, সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ফুড পয়জনিং, টাইফয়েড এবং ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত ও মশাবাহিত নানা রোগ। সুস্থ থাকার জন্য এসব রোগের কারণ, লক্ষণ, ঘরোয়া প্রতিকার এবং কখন হাসপাতালে যেতে হবে, সে সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

টানা বৃষ্টির সময় মূলত তিন ধরনের রোগ বেশি দেখা যায়—

১. মশাবাহিত রোগ: এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া এবং অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া ছড়ায়। ঘরের কোণে, টবে অথবা ডাবের খোসায় জমে থাকা বৃষ্টির স্বচ্ছ পানিতে মশার বংশবৃদ্ধি দ্রুত হয়।

২. পানিবাহিত রোগ: পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার পানির সঙ্গে সুপেয় পানি মিশে গিয়ে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড এবং জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ এবং ই) ছড়ায়।

৩. ভাইরাসজনিত ও চর্মরোগ: স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া এবং বৃষ্টির পানিতে ভেজার কারণে ভাইরাল ফ্লু (সর্দি-কাশি-জ্বর), ছত্রাকজনিত চর্মরোগ (হাতে-পায়ে চুলকানি) এবং চোখের

রোগ কনজাংটিভাইটিস (চোখ ওঠা) ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।

রোগের শুরুতে সচেতন হতে লক্ষণগুলো চেনা জরুরি—

১. ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া: তীব্র জ্বর (১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট), চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যথা (চিকুনগুনিয়ায় জয়েন্টের ব্যথা তীব্র হয়) এবং চামড়ায় লালচে র‍্যাশ।

২. টাইফয়েড, ফুড পয়জনিং ও ডায়রিয়া: একটানা উচ্চ তাপমাত্রা, পেটব্যথা, বমি, কোষ্ঠকাঠিন্য বা পাতলা পায়খানা এবং প্রচণ্ড দুর্বলতা। ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে ঘন ঘন পানির মতো পাতলা পায়খানা ও বমি।

৩. ভাইরাল ফ্লু: নাক দিয়ে পানি পড়া, গলাব্যথা, হালকা জ্বর, শরীর ম্যাজম্যাজ করা এবং শুষ্ক কাশি।

হাসপাতালে যাওয়ার আগে বা মৃদু লক্ষণের ক্ষেত্রে ঘরেই কিছু প্রাথমিক যত্ন নেওয়া যেতে পারে—

১. পর্যাপ্ত তরল খাবার: ডায়রিয়া বা বমি হলে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর খাওয়ার স্যালাইন (ওআরএস) খেতে হবে। এ ছাড়া ডাবের পানি, ভাতের মাড় এবং লেবুর শরবত শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে বাঁচাবে।

২. জ্বরের যত্ন: ডেঙ্গু বা সাধারণ ফ্লু—যা-ই হোক না কেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্যারাসিটামল ব্যতীত অন্য কোনো ব্যথানাশক (যেমন আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক ইত্যাদি) খাওয়া যাবে না। এ ছাড়া ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর বারবার মুছে দিতে হবে।

৩. ভেষজ উপাদান: সর্দি-কাশির জন্য আদা-চা, তুলসী পাতার রস, মধু এবং গরম পানির ভাপ (ইনহেলেশন) দারুণ উপকারী।

৪. ত্বকের যত্ন: বৃষ্টির পানিতে ভিজলে যত দ্রুত সম্ভব সাবান দিয়ে গোসল করার পর শরীর ভালো করে শুকিয়ে নিতে হবে এবং চর্মরোগ আক্রান্ত স্থানে অ্যান্টিফাঙ্গাল পাউডার অথবা ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে।

সব রোগ ঘরে বসে চিকিৎসা সম্ভব নয়। নিচের বিপদচিহ্নগুলো দেখা দিলে অবহেলা না করে অবশ্যই দ্রুততম সময়ে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে—

‘প্রতিরোধই প্রতিকারের চেয়ে শ্রেয়’—এই নীতি মেনে চললে বর্ষার রোগবালাই থেকে অনেকটা দূরে থাকা সম্ভব—

একটানা বৃষ্টির দুর্যোগে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের (সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা) ভূমিকা অপরিসীম।

১. জলাবদ্ধতা নিরসন: ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা, যাতে মশা বংশবৃদ্ধি করতে না পারে।

২. মশকনিধন অভিযান: নিয়মিত ক্রাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে করা।

৩. সুপেয় পানির নিশ্চয়তা: দুর্গত কিংবা প্লাবিত এলাকায় সরকারিভাবে নিরাপদ পানির জার এবং পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি বিতরণ করা।

৪. বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ক্যাম্পিং: সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা এবং বিনা মূল্যে এনএস-১ (NS1) পরীক্ষার সুযোগ করে দেওয়া।

৫. গণসচেতনতা বৃদ্ধি: রেডিও, টেলিভিশন এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা।

টানা বৃষ্টি প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ হলেও অসচেতনতার কারণে তা অভিশাপে পরিণত হতে পারে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আমরা যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন থাকি, চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখি এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই, তাহলে বর্ষাকালীন এসব রোগবালাই খুব সহজে মোকাবিলা করা সম্ভব।

ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপকমাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ