কুড়িগ্রামে বাড়ছে তাপমাত্রা, কমছে বৃষ্টিপাত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জেলার আবহাওয়ায় দেখা দিচ্ছে নতুন বাস্তবতা। ফলে সরাসরি এর প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। ফলে জৈব ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি পদ্ধতি গ্রহণ করে টিকে থাকার নতুন পথ খুঁজছেন জেলার কৃষকরা।
রাজারহাট আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ছয় বছরে জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
জলবায়ু-সহনশীল কৃষি পদ্ধতিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে কৃষকরা ঝুঁকছেন জৈব সার, ট্রাইকো কম্পোস্ট, মালচিং, ফেরোমন ফাঁদ, রঙিন আঠালো ফাঁদ ও জৈব বালাই নাশক ব্যবহারে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং নিরাপদ সবজি উৎপাদনেও ইতিবাচক ফল মিলছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে কৃষকরা মাটির স্বাস্থ্য, ফসল ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব বালাই দমন বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে পারেন। মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকেন।

জেলার রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মহিধর ও খণ্ডক্ষেত্র গ্রামের কৃষক-কৃষাণীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা শিম, করলা, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শসাসহ বিভিন্ন সবজি চাষে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশ ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় ওই দুই গ্রামের লাভলী বেগম, মোসলেম, আবুল হোসেন, মিনতী রাণীসহ ২০ জন কৃষক প্রায় পাঁচ একর জমিতে নিরাপদ ফসল উৎপাদন করছেন। তারা ট্রাইকো কম্পোস্ট, মালচিং পেপার, হলুদ, সাদা ও নীল আঠালো ফাঁদ, ফেরোমন ফাঁদসহ বিভিন্ন জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছেন।
কৃষাণী লাভলী বেগম বলেন, ২০ শতক জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে করলার চাষ করেছেন তিনি।
তার ভাষায়, হলুদ ফাঁদ ও বিষটোপ ব্যবহার করায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার প্রায় বন্ধ করা গেছে। এতে উৎপাদন খরচ কমেছে, ফলনও ভালো হয়েছে। বাজারদর ভালো থাকলে লাভ আরও বাড়বে।
কৃষক আবুল হোসেন বলেন, আগে নিয়মিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হতো। এখন জৈব সার, ফেরোমন ফাঁদ ও রঙিন আঠালো ফাঁদ ব্যবহারে ভালো ফল পাচ্ছেন। এতে সার ও কীটনাশকের খরচ যেমন কমেছে তেমনি রোগবালাইয়ের আক্রমণও কমেছে।
ছিনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেন, কৃষিনির্ভর এ এলাকায় একসময় অধিকাংশ কৃষক ধান ও পাট চাষ করতেন। এখন আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে অনেকেই সবজি চাষে ঝুঁকছেন। ফলে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এতে কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান দুইই বেড়েছে।

রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. সাইফুন্নাহার সাথী বলেন, জমিতে জৈব সার ও কম্পোস্ট ব্যবহার করলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে। আবার মালচিং পদ্ধতিতে মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে রাখা সম্ভব হয়। তাপপ্রবাহের সময় নতুন করে চারা রোপণ না করা, প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং রোগবালাই দমনে নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রার মধ্যে কৃষিতে টিকে থাকতে হলে আগাম পরিকল্পনা, মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণ, জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জেলা ও উপজেলা কৃষি বিভাগ নিয়মিত কৃষকদের প্রশিক্ষণ, কৃষক মাঠ স্কুল, প্রদর্শনী প্লট, জৈব সার ব্যবস্থাপনা, ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে।
এফএ/এএসএম








