দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ তরমুজ উৎপাদিত হলেও ফলটির একটি বড় অংশ মৌসুম শেষে অপচয়ের শিকার হয়। লাল অংশ নেওয়ার পর বাকি খোসায় তৈরি হয় বিশাল বর্জ্য। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তরমুজের খোসা ঘিরেই গড়ে উঠতে পারে নতুন সম্ভাবনাময় শিল্পখাত।

কৃষি ও খাদ্যপ্রযুক্তি গবেষকরা বলছেন, বৈজ্ঞানিকভাবে তরমুজের খোসা থেকে সিট্রুলিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড নিষ্কাশন করা সম্ভব। যা ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া খোসা থেকে পেকটিন ও বীজ থেকে তেল বা পশুর খাদ্য তৈরি করা যায়। প্রযুক্তির অভাবে এগুলো এখন শুধুই আবর্জনা।

বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও বরগুনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় উৎপাদিত তরমুজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খোসা। সাধারণত ভোক্তারা ফল খাওয়ার পর খোসার অংশ ফেলে দেন। ফলে বিপুল পরিমাণ জৈব বর্জ্য সৃষ্টি হয়, যা দ্রুত পচে পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ গবেষকদের মতে, এই খোসাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা সম্ভব নানা ধরনের খাদ্যপণ্য।

এছাড়া তরমুজের খোসা থেকে খাদ্যশিল্প তৈরির পাশাপাশি সিট্রুলিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড ওষুধ শিল্পে ব্যবহারের জন্য কাজে লাগানো গেলেও দক্ষিণাঞ্চলে এটা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা করতে দেখা যায়নি।

তরমুজের খোসায় নতুন সম্ভাবনা, খাদ্য থেকে হতে পারে আয়ের উৎস

পটুয়াখালী জেলার দুমকী উপজেলার আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলিমুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, একটি তরমুজের উল্লেখযোগ্য অংশই খোসা ও বীজ। অনেকেই এই অংশ ফেলে দেন। যা দ্রুত পচন ধরে মিথেন গ্যাস তৈরি হয় এবং দুর্গন্ধ ছড়ায়। বেশিরভাগ মানুষ এগুলো ফেলে দিলেও খাদ্যশিল্পে এসব অংশের বাণিজ্যিক ব্যবহার রয়েছে। সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তরমুজের খোসা থেকে মূল্য সংযোজিত পণ্যও তৈরি করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

অনলাইন আম ব্যবসায়ীদের লাভের গুড় খাচ্ছে ফেসবুক বিজ্ঞাপন

আচার: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরমুজের সাদা খোসা দিয়ে আচার তৈরির প্রচলন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আচার দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং বাজারজাত করারও সুযোগ রয়েছে।

জ্যাম ও মোরব্বা: সাদা অংশে পর্যাপ্ত আঁশ থাকায় এটি দিয়ে মোরব্বা, জ্যাম ও মিষ্টিজাত পণ্য তৈরি করা সম্ভব। খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে এসব পণ্যের চাহিদাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

সবজি হিসেবে ব্যবহার: গবেষকরা বলছেন, তরমুজের খোসার ভেতরের সাদা অংশ তরকারি, ভাজি কিংবা স্যুপে ব্যবহার করা যায়। অনেক দেশে এটি দৈনন্দিন খাদ্যের অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ফলে খোসাকে বর্জ্য হিসেবে না দেখে পুষ্টিকর খাদ্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন

চীনে ফল রপ্তানিতে থাইল্যান্ড-ভিয়েতনামের রাজত্ব, বাংলাদেশের বড় সুযোগ

পশুখাদ্য ও কম্পোস্ট সার: তরমুজের খোসা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার না করা গেলেও গবাদিপশুর খাদ্য এবং জৈবসার তৈরির কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগানো যায়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে একদিকে যেমন খাদ্য অপচয় কমবে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।

পুষ্টিবিদ ও খাদ্যপ্রযুক্তি গবেষকদের মতে, তরমুজের বিচিও অত্যন্ত পুষ্টিকর।

তরমুজের খোসায় নতুন সম্ভাবনা, খাদ্য থেকে হতে পারে আয়ের উৎস

ভাজা বিচি: শুকিয়ে বিচি ভেজে স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া যায়।

বিচির গুঁড়া: বেকারি পণ্য, বিস্কিট ও পুষ্টিকর খাদ্যে ব্যবহার করা যায়।

তেল উৎপাদন: তরমুজের বিচি থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার কিছু দেশে এ ধরনের তেল ব্যবহৃত হয়।

প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান: বিচিতে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও খনিজ উপাদান থাকায় এটি খাদ্যশিল্পে মূল্যসংযোজন পণ্য হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন

যেভাবে এলো বেদানা লিচু

কৃষকের আয় বাড়াতে পারে খোসা-ভিত্তিক শিল্প

দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমে তরমুজের উৎপাদন বেশি হওয়ায় অনেক সময় বাজারমূল্য কমে যায়। আবার সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল নষ্টও হয়।

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার কৃষক নান্না গাজী বলেন, উৎপাদন ভালো হলেও সংরক্ষণের অভাবে অনেক তরমুজ বিক্রি করা যায় না। ফলের পাশাপাশি খোসা থেকেও যদি বাণিজ্যিক পণ্য তৈরি করা যায়, তাহলে কৃষকরা অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পাবেন।

গলাচিপা উপজেলার কৃষক দেলোয়ার হোসেনও একই মত প্রকাশ করে বলেন, তরমুজের বিভিন্ন অংশের শিল্পভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই খাত থেকে আরও বড় অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন সম্ভব হবে।

খাদ্যপ্রযুক্তি গবেষকদের মতে, তরমুজকে শুধুমাত্র একটি মৌসুমি ফল হিসেবে না দেখে এর উপপণ্যগুলোকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে হবে। বিশেষ করে খোসা থেকে আচার, জ্যাম, মোরব্বা, পশুখাদ্য ও জৈবসার উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া গেলে নতুন বাজার সৃষ্টি হবে।

তারা মনে করেন, তরমুজের খোসা-ভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলা গেলে খাদ্য অপচয় কমবে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং গ্রামীণ এলাকায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে বর্তমানে যেটি বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই হয়ে উঠতে পারে একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী সম্পদ।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান অনুষদের চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, তরমুজের খোসা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা হয়নি। তবে বিভিন্ন লিটারেচার ঘেটে জানা গেছে, তরমুজের খোসা থেকে বিভিন্ন খাদ্য উপকরণ তৈরির পাশাপাশি সিট্রুলিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড নিষ্কাশন করা সম্ভব। যা ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত হয়।

এফএ/জেআইএম