বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পকে আগামী দশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক (ডেটা-ড্রিভেন) ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যবসার নতুন মূলধন হিসেবে ডেটাকে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উৎপাদন, টেকসই উন্নয়ন ও সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন পিডব্লিউসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার অ্যান্ড পার্টনার শামস জামান।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডার্স অ্যালায়েন্স (বায়লা) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘বায়লা ফিউচার সামিট–২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে ‘ডেটা দ্যাট ড্রাইভস ডিসিশন: প্রিপেয়ারিং ফর দ্য নেক্সট ডেকেড’ শীর্ষক সেশনে এ সুপারিশ করেন শামস জামান।
রাজধানীর হোটেল র্যাডিসনে সোমবার (২০ জুলাই) দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন করে বায়লা।
শামস জামান বলেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছে। লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, রপ্তানি আয় বাড়িয়েছে এবং বৈশ্বিক বাজারে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। তবে আগামী দিনের প্রতিযোগিতা অতীতের মতো শুধু কম খরচে উৎপাদন বা বড় উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। বরং বুদ্ধিদীপ্ত উৎপাদন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনাই হবে মূল চালিকাশক্তি।
শিল্পের জন্য পরামর্শ
শামস জামান রপ্তানিমুখি তৈরি পোশাক খাতের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেন, যেগুলো সামনের দিনে প্রজুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও ব্যাবহারে সহায়ক হবে।
তিনি বলেন, পোশাক খাতে ডেটাকে ব্যবসার কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শ্রম, কারখানা ও অর্থের পাশাপাশি তথ্যই আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মূলধন হবে। তাই তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং তা কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, ডেটাকে শুধু আইটি বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্বের অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং এ বিষয়ে একটি সাংগঠনিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
তার মতে, ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে স্মার্ট উৎপাদনের ওপর। শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং দক্ষতা, দ্রুততা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীল উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, তুরস্ক এবং আফ্রিকার উদীয়মান উৎপাদন কেন্দ্রগুলো অটোমেশন, ট্রেসেবিলিটি ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তাই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশকেও প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
শামস জামান বলেন, টেকসই উৎপাদনের ক্ষেত্রে শুধু সার্টিফিকেট বা অডিটের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। পরিবেশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কিত তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রমাণসহ উপস্থাপনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে। এজন্য পণ্যের কাঁচামালের উৎস, ব্যবহৃত রাসায়নিক, কার্বন নিঃসরণ, পানির ব্যবহারসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কাঁচামালের উৎস, শ্রমমান, পরিবেশগত মান এবং টায়ার-১-এর বাইরেও পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের তথ্য প্রদর্শনের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
শামস জামানের মতে, টেকসই উন্নয়নকে শুধু ক্রেতার অডিট বা কমপ্লায়েন্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। পরিবেশগত ও সামাজিক তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং ব্যবস্থাপনাকে প্রতিদিনের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হবে।
ক্রেতাদের চাহিদার তথ্যভিত্তিক প্রমাণ
শামস জামান বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন আর শুধু কম দামে মানসম্মত পণ্য ও সময়মতো সরবরাহ চান না। তারা জানতে চান কাঁচামাল কোথা থেকে এসেছে, উৎপাদনে কতটুকু কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, কত পানি ব্যবহৃত হয়েছে এবং শ্রম ও পরিবেশগত মান কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ দেখাতে না পারলে ভবিষ্যতে বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে।
তিনি বলেন টেকসই উন্নয়ন এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়; এটি প্রমাণের বিষয়। আর সেই প্রমাণের ভিত্তি হলো তথ্য।
ইইউর নতুন বিধান বড় চ্যালেঞ্জ
শামস জামান জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবিত ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট চালু হলে প্রতিটি পোশাকপণ্যের সঙ্গে কাঁচামালের উৎস, উপাদানের গঠন, টেকসই বৈশিষ্ট্য, পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা এবং অন্যান্য পরিবেশগত তথ্য ডিজিটালভাবে যুক্ত থাকবে।
এছাড়া ইইউর করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্টিং-সংক্রান্ত নতুন বিধানের কারণে বড় কোম্পানিগুলোকে পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাবের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। ফলে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকেও এখন থেকেই তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিতে হবে।
তার মতে, যেসব প্রতিষ্ঠান এখন থেকেই তথ্যনির্ভর ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও টেকসই উৎপাদনে বিনিয়োগ করবে, তারাই ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।
আইএইচও/এএমএ








