চলতি মৌসুমে দেশজুড়ে থেমে থেমে বর্ষণ ও জমে থাকা পরিষ্কার পানিকে পুঁজি করে মারাত্মক রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গুজ্বরের বাহক এডিস মশার প্রজনন। অতিবৃষ্টিতে প্রজননস্থল ধুয়ে মুছে গেলেও থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিতে উল্টো এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, এসির ট্রে, প্লাস্টিকের ড্রাম কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে কোটি কোটি মশা।এর ফলে দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি। চলতি বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসকে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে ডেঙ্গু সংক্রমিত হলে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।দ্বিতীয় দফা সংক্রমণে জটিলতা ও নীরব ঘাতক 'ক্রিটিক্যাল ফেজ'অনেকের মনে ধারণা রয়েছে একবার ডেঙ্গু হলে পরবর্তীতে আর হওয়ার আশঙ্কা থাকে না, যা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল। ডেঙ্গু ভাইরাসের মোট চারটি ভিন্ন সেরোটাইপ রয়েছে। একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে সেটির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলেও বাকি তিনটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কবিরুল বাসার জানান, "দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে রোগীদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।"জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো আক্রান্তদের দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া। অনেক সময় রোগী বা স্বজনরা জ্বর কমে যাওয়াকে সুস্থতার লক্ষণ ভেবে ভুল করেন। অথচ জ্বর কমার এই সময়টিতেই শুরু হয় বিপজ্জনক 'ক্রিটিক্যাল ফেজ'। তখন শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ কিংবা শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়। তাই তীব্র পেটব্যথা, ঘন ঘন বমি, মাত্রাতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।১২৬ প্রজাতির মশার আবাসস্থল বাংলাদেশ, ঢাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১৬ প্রজাতিবিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণীদের অন্যতম মনে করা হয় মশাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ আজ ডেঙ্গু ঝুঁকিতে। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ১৮৭৭ সালে ব্রিটিশ ডাক্তার প্যাট্রিক ম্যানসন প্রথম আবিষ্কার করেন যে কিউলেক্স মশা ফাইলেরিয়াল রাউন্ডওয়ার্ম বহন করে।পরবর্তীতে ১৮৯৭ সালে অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া ছড়ানোর বিষয়টি প্রমানিত হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২৬ প্রজাতির মশা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ১৪ থেকে ১৬ প্রজাতির মশার উপদ্রব রয়েছে। বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগগুলোর মধ্যে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া ও জাপানিজ অ্যানসেফালাইটিস অন্যতম।ঢাকায় ১৯৬৩ সালে প্রথম ডেঙ্গুর উৎপত্তি হয় এবং তখন এটি 'ঢাকা ফিভার' নামে পরিচিতি পায়। পরে ২০০০ সালে ডেঙ্গু বড় আকার ধারণ করলে এটিকে ডেঙ্গু হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেন বিজ্ঞানীরা।আক্রান্ত ১৭ হাজার ছাড়াল, পর্যটন নগরী কক্সবাজারেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতিস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৯৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪০৯ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে ৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধও রয়েছেন।এই মরণব্যাধিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত ৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ১২৮১ জন চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে, প্রধান পর্যটন জেলা কক্সবাজারেও মশার প্রজনন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজারে এ পর্যন্ত ৫৭২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া রোগীদের হিসাব মেলানো গেলে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।ব্যক্তিগত সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল অস্ত্রকীটতত্ত্ববিদদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ছাদ, কার পার্কিং বা বেসমেন্টে জমে থাকা পানি, বারান্দার ফুলের টব কিংবা এসির ট্রের পানি তিন দিনের বেশি জমতে দেওয়া যাবে না।

কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাসার বলেন, "বাড়ির ছাদ, বারান্দায় ফুলের টব, এসির ট্রে কিংবা প্লাস্টিকের ড্রামে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদের সম্পৃক্ত করে মশার উৎসে একযোগে ধ্বংস অভিযান চালাতে হবে।" কেবল মশক নিধন কর্মসূচি বা ওষুধ ছিটানোর ওপর নির্ভর না করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এই প্রাণঘাতী ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।